চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্তটি কেবল একটি আর্থিক সমন্বয় নয়—এটি দেশের শিক্ষা নীতি, উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ভবিষ্যৎ ধারা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। মূল বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুযায়ী শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল ২৮ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা। তবে বাস্তবায়ন অগ্রগতি কম এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতার কারণ দেখিয়ে সংশোধিত এডিপিতে (আরএডিপি) প্রায় ৯ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা কমিয়ে বরাদ্দ নামিয়ে আনা হয়েছে ১৮ হাজার ৬২৮ কোটিতে—যা মোটের উপর প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি কাটছাঁট।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৯টি সদস্য দেশের মধ্যে অর্থনীতির আকারের তুলনায় সবচেয়ে কম শিক্ষা বরাদ্দ দেওয়া দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ ইতিমধ্যে অবস্থান করছে উপরের দিকেই। দেশের জিডিপির ২ শতাংশেরও কম অংশ শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ হয়—যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায়ও কম। গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরেই শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম ছিল; তার ওপর আবার আরএডিপিতে বড় ধরণের ছাঁটাই, ফলে নীতি পর্যায়ে শিক্ষার অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সংশোধিত এডিপির খসড়ায় দেখা যায়, বরাদ্দ কমার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে। এই খাতে বরাদ্দ কমেছে ৪৭ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৫ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। আগে যেখানে বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ৯১৭ কোটি, তা নেমে এসেছে ৬ হাজার ৩১৫ কোটিতে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন, অবকাঠামো, গবেষণা তহবিল, ল্যাব ও প্রযুক্তি উন্নয়ন–এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিপরীতে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে — প্রায় ২ হাজার ২৫১ কোটি টাকা যোগ করে বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৫৪ কোটি টাকায়। যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, প্রাথমিক শিক্ষায় অবকাঠামো, উপবৃত্তি, উপকরণ সরবরাহ ও স্কুল উন্নয়ন প্রকল্পের গতি তুলনামূলক ভালো। তবে এই বাড়তি বরাদ্দও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
অন্যদিকে কারিগরি ও মাদ্রাসাশিক্ষা বিভাগে বরাদ্দ সামান্য—মাত্র ৫৩ কোটি টাকা বা ১.৭০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অথচ শিল্পায়নের সাথে সমন্বিত দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য এ খাতকে গুরুত্ব বৃদ্ধির দাবি দীর্ঘদিনের।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য বলছে—
গত ৫ মাসে শিক্ষা খাতের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকল্পে বাস্তবায়ন হার খুবই কম। যেমন—
সরকারি ভাষ্যে বলা হচ্ছে —
“যেখানে ব্যয় সক্ষমতা নেই, সেখানে বরাদ্দ ধরে রাখার যৌক্তিকতা নেই; তাই আরএডিপিতে সমন্বয় করা হয়েছে।”
অর্থাৎ বরাদ্দ কমানোর সরাসরি কারণ হিসেবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, টেন্ডার জটিলতা, ধীর গতি ও প্রশাসনিক বিলম্বকে দায়ী করা হয়েছে।
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন —
তাঁর মতে—
তিনি আরও বলেন—
নীতিগত অগ্রাধিকারের অভাবে
শিক্ষার মান, গবেষণা, শিক্ষকের সক্ষমতা—সব ক্ষেত্রেই স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বরাদ্দ ছাঁটাইয়ের প্রভাব দেখা যেতে পারে—
অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সাশ্রয়ের বিনিময়ে
দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এডিপি বরাদ্দ কমানো কেবল বাস্তবায়ন সমস্যার প্রতিফলন নয়—
এটি দেশের শিক্ষা খাতের প্রতি নীতি-অগ্রাধিকার কতটা দুর্বল, তারই বড় ইঙ্গিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত মানবসম্পদ গঠন ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হয় না;
তাই শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ কাটছাঁটের পরিবর্তে দুর্বলতা চিহ্নিত করে সক্ষমতা বাড়ানোই ছিল অধিক যৌক্তিক পথ।
Leave a Reply