নতুন জাতীয় পে-স্কেল প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়াটি এখন এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কার্যত আমলা ও সচিবদের মতামতই চূড়ান্ত রূপ পাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শুরু থেকেই সচিবদের একটি প্রভাবশালী অংশ পে কমিশনের ওপর সক্রিয়ভাবে চাপ প্রয়োগ করে আসছিলেন, যাতে বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন না আসে। বিশেষ করে তারা স্পষ্টভাবে মত দেন—বেতন যেন তিনগুণ বা চারগুণ বৃদ্ধি না করা হয়। এই অবস্থান অনেকের কাছে ‘নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করার’ মতো হলেও বাস্তবে সেটিই এখন কমিশনের মূল দিকনির্দেশনা হয়ে উঠেছে।
পে কমিশন গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে যে ধারণা সামনে এসেছিল, তা ছিল তুলনামূলকভাবে আশাব্যঞ্জক। তখন বলা হচ্ছিল—উচ্চ গ্রেডের বেতন বৃদ্ধি সীমিত রেখে নিম্ন ও মধ্যস্তরের কর্মচারীদের বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হবে, যাতে দীর্ঘদিনের বৈষম্য কিছুটা হলেও কমে আসে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অবস্থান বদলে যেতে শুরু করে। সচিব ও উচ্চপদস্থ আমলাদের চাপ, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের কারণে পে কমিশনের কর্মকর্তারা তাদের প্রাথমিক অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হন।
বর্তমানে পে কমিশন যে কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তার মূল দর্শন হলো—সব গ্রেডে মোটামুটি দ্বিগুণ বা দ্বিগুণের কাছাকাছি হারে বেতন বৃদ্ধি করা। আপাতদৃষ্টিতে এটি ‘সমতা’ মনে হলেও বাস্তবে এর ফলাফল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ উচ্চ গ্রেডে দ্বিগুণ বৃদ্ধি মানেই বিপুল অঙ্কের অতিরিক্ত সুবিধা, আর নিম্ন গ্রেডে সেই দ্বিগুণ বৃদ্ধি বাস্তব জীবনের ব্যয়ভার সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
এই প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী জাতীয় বেতন কমিশন গ্রেড-১ এর কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৪ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। গ্রেড-২ এ প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৪২৬ টাকা, গ্রেড-৩ এ ১ লাখ ৯ হাজার ৮৪ টাকা, গ্রেড-৪ এ ৯৬ হাজার ৫৩৪ টাকা এবং গ্রেড-৫ এ ৮৩ হাজার ২০ টাকা মূল বেতন। এসব গ্রেডের কর্মকর্তারা এর পাশাপাশি বাড়িভাড়া, গাড়ি, জ্বালানি, ফোন বিল, চিকিৎসা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও ভোগ করেন, যা বেতনের বাইরেও বড় আর্থিক সুবিধা তৈরি করে।
উচ্চ গ্রেডের পরবর্তী ধাপগুলোতেও বেতন বৃদ্ধির অঙ্ক তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য। গ্রেড-৬ এ ৬৮ হাজার ৫৩৯ টাকা, গ্রেড-৭ এ ৫৫ হাজার ৯৯০ টাকা, গ্রেড-৮ এ ৪৪ হাজার ৪০৬ টাকা, গ্রেড-৯ এ ৪২ হাজার ৪৭৫ টাকা এবং গ্রেড-১০ এ ৩০ হাজার ৮৯১ টাকা মূল বেতন প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে প্রশাসনের মধ্য ও উচ্চ স্তরের কর্মকর্তারা সামগ্রিকভাবে একটি শক্ত আর্থিক সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে অবস্থান করবেন।
অন্যদিকে, মধ্য ও নিম্নস্তরের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির চিত্র ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে। প্রস্তাব অনুযায়ী গ্রেড-১১ তে মূল বেতন ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ১৩৪ টাকা এবং গ্রেড-১২ তে ২১ হাজার ৮১৭ টাকা। গ্রেড-১৩ এ ২১ হাজার ২৩৮ টাকা, গ্রেড-১৪ এ ১৯ হাজার ৬৯৩ টাকা এবং গ্রেড-১৫ এ ১৮ হাজার ৭২৮ টাকা মূল বেতন প্রস্তাব করা হয়েছে। এই স্তরের কর্মচারীরাই মূলত মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করেন এবং তাদের ওপরই দপ্তরের দৈনন্দিন কার্যক্রম নির্ভরশীল।
নিম্নতম স্তরের কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত কাঠামো আরও বেশি হতাশাজনক। গ্রেড-১৬ এ মূল বেতন ১৭ হাজার ৯৫৫ টাকা, গ্রেড-১৭ এ ১৭ হাজার ৩৭৬ টাকা, গ্রেড-১৮ এ ১৬ হাজার ৯৯০ টাকা, গ্রেড-১৯ এ ১৬ হাজার ৪৪১ টাকা এবং সর্বনিম্ন গ্রেড-২০ এর কর্মচারীদের জন্য ১৫ হাজার ৯২৮ টাকা মূল বেতন নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমান বাজারদর, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ের সঙ্গে এই অঙ্কের কোনো বাস্তবসম্মত সামঞ্জস্য নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমার প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সামনে যে সুপারিশ আসতে যাচ্ছে, তা প্রায় এই কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বড় ধরনের কোনো সংশোধন বা পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনা খুবই কম। এর অর্থ হলো—উচ্চস্তরের কর্মকর্তারা তুলনামূলকভাবে আরও বেশি সুবিধা ভোগ করবেন, আর নিম্নস্তরের কর্মচারীরা আগের মতোই বৈষম্যের শিকার হবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কাঠামোর মাধ্যমে বেতন বৈষম্য কমার পরিবর্তে কার্যত বহালই থাকছে। অনেক কর্মচারী সংগঠন আশা করেছিল বেতন ব্যবধান ১:৬ বা সর্বোচ্চ ১:৮ অনুপাতে নামিয়ে আনা হবে বা গ্রেড সংখ্যা কমিয়ে ১২টি বা ১৬টি করার হবে। কিন্তু বাস্তবে তা আর হচ্ছে না। পূর্ববর্তী পে-স্কেলের মতোই এই ব্যবধান ১:১০ বা তারও বেশি অনুপাতে থেকে যাচ্ছে, এবং গ্রেডের সংখ্যা সেই পূর্বের ন্যায় ২০টি থেকেই যাচ্ছে। যা প্রশাসনের ভেতরে অসন্তোষ ও বৈষম্যের বোধ আরও গভীর করবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন পে-স্কেল একটি কাঠামোগত সংস্কারের সুযোগ তৈরি করলেও সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো হচ্ছে না। বরং প্রশাসনিক অভিজাত শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করেই আরেকটি পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার, যার প্রকৃত মূল্য দিতে হবে দেশের মধ্য ও নিম্নস্তরের সরকারি কর্মচারীদের।
সমাজে যার যার মর্যাদা অনুযায়ী তার খরচ। একজন সচিবের থেকে সমাজ যা প্রত্যাশা করে একজন বিষ গ্রেডের কর্মচারী থেকে তা প্রত্যাশা করে না।