ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রশাসনিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত সিদ্ধান্ত হলো— বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্বে না রাখা। রোববার (৭ ডিসেম্বর) নির্বাচন সম্পর্কিত সার্বিক প্রস্তুতি ও ভোট আয়োজন-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তৃত পর্যালোচনা বৈঠকের পর নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ বছর প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসারের দায়িত্ব শুধুমাত্র সরকারি ও আধা-সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ওপর ন্যস্ত করা হবে। সাধারণত সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রের কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা এ দায়িত্ব পালন করেন। তবে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির কারণে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের এবার সম্পৃক্ত করা হবে না।
নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোট গ্রহণে নিরপেক্ষতা ও আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করতে তারা অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে নিয়োগ, ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক প্রবাহের বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে ধরনের আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে, তাও ইসির এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে বলে ধারণা করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কমিশনার সানাউল্লাহ জানান, চলতি সপ্তাহেই তফসিল ঘোষণা করা হবে। তফসিল ঘোষণার দিনের পর থেকেই আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং প্রতিটি উপজেলায় দুইজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ২৪ ঘণ্টার মনিটরিংয়ে দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচনী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা শক্তিশালী করতে ম্যাজিস্ট্রেটদের ভূমিকা এবার আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ভোটের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। নতুন সূচি অনুযায়ী সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ভোট চলবে। ভোটের আগের রাতে ব্যালট পেপার কেন্দ্রে পৌঁছানোর বিষয়েও এবার কঠোর ব্যবস্থাপনা নেওয়া হবে।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের আগমুহূর্তে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নির্বাচনী দায়িত্ব নিয়ে উত্তাপ তৈরি হয়েছিল। গত অক্টোবরে বিএনপি ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল ও ইবনে সিনা হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচন দায়িত্বে যুক্ত না করার আহ্বান জানায়। তাদের দাবি ছিল— এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব এবং অনিয়মের অভিযোগ আছে, যা নির্বাচনী নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
২৬ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বিএনপির এই আহ্বানে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সেবামূলক ও অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এককভাবে লক্ষ্য করে এমন দাবি সন্দেহ তৈরি করতে পারে। তার মতে, নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক চাপমুক্ত থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়া একদিকে নির্বাচন কমিশনের সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিতর্কও প্রশমিত করতে পারে। তবে এতে দায়িত্বভার সরকারি ব্যাংকের ওপর আরও বাড়বে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ভোটের দিন দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন, নিরাপত্তা—এসব বিষয় নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে।
মোটের ওপর নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো নির্বাচনী পরিবেশকে আরও নিয়ন্ত্রিত, তদারকি-নির্ভর এবং সংগঠিত দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে প্রশাসন আরও সক্রিয় হবে এবং ভোটের দিন পর্যন্ত ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি থাকবে।
Leave a Reply