বাংলাদেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘ সময় ধরে এমপিও সুবিধার বাইরে থেকে প্রায় বিনা সম্মানী বা অতি স্বল্প বেতনে কাজ করে আসছেন। তাদের এই কঠিন বাস্তবতা দুর্ভোগের নতুন নয়—কেউ কেউ ১০–১৫ বছর ধরে নিয়মিত পাঠদান করলেও আর্থিক নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান ঘটাতে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা শিক্ষক সমাজে ব্যাপক আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। এ লক্ষ্যে সরকার সম্প্রতি নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো এবং পরিমার্জিত এমপিও নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে। নীতিমালা প্রকাশের পরপরই সরকার আবেদন আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি দেবে, যার মাধ্যমে সারা দেশের সব নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান আবেদন করতে পারবে।
২০২২ ও ২০২৩ সালে তিন ধাপে মোট ৩,০৬২টি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করেছিল পূর্ববর্তী সরকার। ২০২২ সালের জুলাইয়ে ছিল ২,৭১৬টি, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ২৫৫টি এবং একই বছরের অক্টোবরে ৯১টি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই এমপিওভুক্তির তালিকাকে ঘিরে অভিযোগ কম ছিল না। বহু শিক্ষক ও সংগঠন অভিযোগ তোলে যে ওই সময় এমপিওভুক্তির তালিকা তৈরি করতে রাজনৈতিক তদবির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে—অনেক এমপি-মন্ত্রী ও স্থানীয় নেতাদের প্রভাবের কারণে কিছু অনুন্নত বা অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য প্রতিষ্ঠান তালিকায় যুক্ত হয়। এর ফলে প্রকৃত যোগ্য প্রায় ৩,০০০টি প্রতিষ্ঠান এমপিও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে।
এই বিতর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে আনে—বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা ইতোমধ্যে আর্থিক সংকটে ভুগছিলেন; রাজনৈতিক প্রভাব ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া সেই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। বহু শিক্ষক তখন আন্দোলন, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করেও কাঙ্ক্ষিত অধিকার পায়নি।
সরকার এবার যে এমপিও নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে, তাতে আগের তুলনায় বেশ কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
এই পরিবর্তনগুলো শিক্ষা খাতে একটি স্বচ্ছ, মাননির্ভর ও শৃঙ্খলাপূর্ণ এমপিও প্রক্রিয়া গড়ে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নীতিমালা জারি হলে নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনলাইনে আবেদন করতে হবে। আবেদন করার পর—
—এসব সূচক বিশদভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
তারপর সরকারের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রথম দফায় প্রায় ২,৬০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিও তালিকায় যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে বিনা বেতনে পাঠদান করা শিক্ষকরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। বেসরকারি কলেজ মাস্টার্স শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি নেকবর হোসেন বলেন, বহু বছর পর সরকার যখন নীতিমালা সংস্কার করে নতুন এমপিও প্রক্রিয়া শুরু করছে, এটি শিক্ষকসমাজের জন্য বড় অর্জন। তার মতে, এমপিও সুবিধা পেলে শিক্ষকরা আর্থিক নিরাপত্তা পাবেন, যা সরাসরি মানসম্মত পাঠদানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্য জোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়া বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান উন্নয়ন করতে হলে প্রথমে শিক্ষকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। এমপিওভুক্তির মাধ্যমে শিক্ষকরা নতুন উদ্যমে ক্লাস নিতে পারবেন, এবং যা শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ফলাফলে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
Leave a Reply