বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে দীর্ঘদিন ধরে যে ভয়াবহ দুর্নীতি চলছিল, তা সম্প্রতি শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় স্পষ্ট হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভুয়া ইনডেক্স তৈরি, জাল আবেদন ব্যবহার, একই ইনডেক্স নম্বরে দ্বৈত পেমেন্ট, নীতিমালা লঙ্ঘন, যাদের অবসর পাওয়ার যোগ্যতা নেই তাদের নামে টাকা ছাড়, এবং সরকারি নিয়ম ভেঙে বিপুল অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে আটকে রাখা—এসব মিলিয়ে অন্তত ৬৭৪ কোটি টাকার বেশি অর্থ লোপাট হয়েছে।
২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের লেনদেন পর্যালোচনা করে এসব অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর, এবং সাম্প্রতিক সময়ে এ প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমাও দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সফটওয়্যার অপারেটর, বোর্ডের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের একটি বড় চক্র অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কষ্টার্জিত অর্থ লুট করেছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ ধরনের অনিয়মে প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থাই নেওয়া হবে। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেছেন, এই প্রতিবেদন এখনও তাদের হাতে পৌঁছায়নি।
অনুসন্ধানে আরও চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে। উদাহরণ হিসেবে ‘০৫৯৫৪২’ ইনডেক্সধারী এক প্রকৃত শিক্ষকের নামে প্রথমে ৩১ লাখ ৯০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। পরে প্রায় একই ইনডেক্স নম্বর ব্যবহার করে সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ভেন্ডরের স্ত্রী জাকিয়া নুসরাতের অ্যাকাউন্টে দ্বিতীয়বার টাকা পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, সফটওয়্যারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করা এবং অভ্যন্তরীণ কর্মীদের যোগসাজশ ছাড়া এমন লেনদেন সম্ভব নয়।
আরও জানা গেছে, ২০ জন শিক্ষক-কর্মচারীর নামে অবসর সুবিধার টাকা তুললেও তারা কেউ এই অর্থের জন্য আবেদনই করেননি। বোর্ড থেকেও কোনও অনুমোদন পাঠানো হয়নি। তবুও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখার একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ২০টি আলাদা অ্যাকাউন্টে ১ কোটি ৩৭ লাখ ৯৬ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছে। নিরীক্ষকদের ভাষায়—এটি স্পষ্টতই একটি সংগঠিত লুটপাটের অংশ।
বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ভুয়া ইনডেক্স তৈরি করে সেই তথাকথিত শিক্ষকদের নামে ১ কোটি ৪২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা তোলা হয়েছে। এসব ইনডেক্স নম্বর আসলে কোনো সরকারি অধিদপ্তরের নথিতেই ছিল না। আবার একই ইনডেক্স নম্বর দুইবার ব্যবহার করে দ্বৈত পেমেন্ট করার ঘটনাও পাওয়া গেছে—যা সফটওয়্যারের স্বাভাবিক নিয়মেই অসম্ভব। বোর্ড কর্মকর্তাদের অনুমতি বা জড়িত থাকা ছাড়া এ ধরনের জালিয়াতি করা সম্ভব নয়। এতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৭৯ লাখ ৬৭ হাজার টাকা।
এছাড়া জাল আবেদনপত্র তৈরি করে প্রকৃত আবেদনকারীর সরকারি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পরিবর্তে নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি ব্যাংকে ৫৮ লাখ ৭৬ হাজার টাকা পাঠানোর প্রমাণও পাওয়া গেছে। বোর্ডের কিছু কর্মকর্তা এসব আবেদন যাচাই না করেই পেমেন্ট অনুমোদন দিয়েছেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ অনিয়ম পাওয়া গেছে স্থায়ী তহবিল বা এনডাউমেন্ট ফান্ড ব্যবস্থাপনায়। আইন অনুযায়ী এসব অর্থ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে রাখার কথা থাকলেও বোর্ড ৬৩৯ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ১১টি বেসরকারি ব্যাংকে এফডিআর আকারে রেখেছে, যেখান থেকে এখনো কোনও ব্যাংক ফেরত দিচ্ছে না। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর বলছে—এ সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে বা কোন নথির ভিত্তিতে নিয়েছে—তার কোনো তথ্যই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া মোট এনডাউমেন্ট ফান্ড থেকে লভ্যাংশের অন্তত ২৫% স্থায়ী তহবিলে জমা রাখার নিয়ম মানা হয়নি, ফলে আরও ২৯ কোটি ২০ লাখ টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে।
অনিয়ম এখানেই শেষ নয়—পারিতোষিক দেওয়ার ক্ষেত্রেও নিয়ম ভেঙে বোর্ডের সব কর্মচারীকে বাড়তি অর্থ দেওয়া হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। একই সঙ্গে এক শিক্ষককে তাঁর প্রাপ্যের চেয়ে ৫ লাখ ৭৯ হাজার টাকা বেশি পরিশোধ করা হয়েছে।
মাউশির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এ বি এম আব্দুল হান্নান বলেছেন, বিগত সরকারের সময় এসব অনিয়ম ঘটেছে এবং শিক্ষকদের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। তাই পুরো বিষয়টির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি।
Leave a Reply