সরকারি চাকরিজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে নবম পে-স্কেল ডিসেম্বরের মধ্যেই বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। তারা ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পে-কমিশনের সুপারিশ চূড়ান্ত করারও আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। সেই সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ায় আন্দোলনের নতুন রূপরেখা সাজাতে শুরু করেছেন কর্মচারীরা। তবে কমিশন সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, কর্মচারীদের আন্দোলন নিয়ে তারা কোনো ধরনের চাপ অনুভব করছেন না এবং বিষয়টি তাদের কাজের ওপর কোনো প্রভাব ফেলছে না।
রবিবার (৩০ সেপ্টেম্বর) পে-কমিশনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানায়, কমিশন বর্তমানে নবম পে-স্কেলের সুপারিশমালা চূড়ান্ত করার কাজে ব্যস্ত রয়েছে। আন্দোলন বা চাপ—এসব কোনো বিষয়ই তাদের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে না। বরং তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সুপারিশমালা তৈরি করতে চাইছেন এবং সে লক্ষ্যেই দ্রুতগতিতে কাজ চলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পে-কমিশনের সঙ্গে জড়িত এক কর্মকর্তা বলেন, আন্দোলন করা গণতান্ত্রিক অধিকার। যে কেউ যে কোনো বিষয়ে আন্দোলন করতে পারেন—এটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ। কর্মচারীরা মহাসমাবেশ করবেন, নাকি কর্মসূচি দেবেন—সে বিষয় কমিশনের কাজের পরিধির বাইরে। কমিশন কেবল নির্দিষ্ট সময়সীমার ভেতরে সুপারিশমালা জমা দেওয়ার লক্ষ্যেই কাজ করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে কর্মরত সচিবদের সঙ্গে ইতোমধ্যে সভা করেছে পে-কমিশন। সচিবরা নবম পে-স্কেল নিয়ে বাস্তবসম্মত সুপারিশ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, অতিমাত্রায় বা আকাশচুম্বী প্রস্তাব দিলে তা সরকারি আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। সম্প্রতি চার দফায় ৭০ জনের বেশি সচিবের সঙ্গে পে-কমিশন বৈঠক করেছে। প্রতিটি পর্যায়ে ১৭ জন বা তারও বেশি সচিব অংশগ্রহণ করে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন।
গত সোমবার (২৪ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের আলোচনার বিষয়ে কমিশনের একটি সূত্র জানায়, অনলাইনে মতামত গ্রহণের পর প্রায় আড়াই শতাধিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। এর পর সচিব পর্যায়ের ৭০ জনের বেশি কর্মকর্তার মতামত নেওয়া হয়। এসব মতামতগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করছে কমিশন।
নাম প্রকাশ না করা আরেক কর্মকর্তা জানান, এত অধিক সংখ্যক সচিবের মতামত গ্রহণ করা ছিল চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ। সবাইকে একত্রে পাওয়া সম্ভব নয়, এ কারণেই চারটি ধাপে আলাদা সভার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিটি সভায় সচিবরা পে-স্কেলের নানা দিক তুলে ধরেছেন। তারা বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন যাতে সুপারিশ বাস্তবসম্মত হয়, যাতে কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব হয় এবং সরকারি আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যও বজায় থাকে।
তিনি বলেন, কয়েকটি সংগঠন বর্তমান বেতন কাঠামোর তিন থেকে চার গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। সচিবরা এসব প্রস্তাবকে ‘অবাস্তব’ ও ‘আকাশচুম্বী’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং এমন প্রস্তাব গ্রহণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন। বরং বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে মিল রেখে বেতন কাঠামোর সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ ৫ থেকে ১০ বছরের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেছেন সচিবরা। একই সঙ্গে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে।
৭০ জন সচিবের সঙ্গে প্রথম বৈঠকের পর পে-কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান বলেন, আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। তবে সব সচিব উপস্থিত না থাকায় সামনে আরও একটি আলোচনা পর্যায় হতে পারে। সুপারিশ জমা দেওয়ার সময়সীমা নিয়ে তিনি বলেন, আলোচনা শেষ হলেই দ্রুত রিপোর্ট জমা দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন।
কমিশন সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুপারিশমালা চূড়ান্তকরণে ইতোমধ্যে অর্ধেকের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চলতি মাসেই চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সর্বনিম্ন বেতন কাঠামো ও গ্রেড পুনর্গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি বাদিউল কবির পে-কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠক শেষে তিনি বলেন, কমিশনের চেয়ারম্যান ব্যক্তিগত মতামত দিতে পারেন না। সব সিদ্ধান্ত কমিশন সদস্যদের যৌথ আলোচনার মধ্য দিয়েই নেওয়া হয়। চেয়ারম্যান যে অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন তা সন্তোষজনক এবং কমিশনের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে বলেই তারা মনে করছেন।
Leave a Reply