সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা পুনর্নির্ধারণ ও বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতীয় বেতন কমিশন ধারাবাহিকভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য কমিশন ইতোমধ্যে সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেছে। তবে এসব বৈঠকে পর্যালোচনা ও আলোচনা বিস্তৃত হলেও এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন শেষে নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে পে স্কেল বাস্তবায়নের কাজ তারা এগিয়ে নেবেন। কিন্তু এই মন্তব্য সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে। তাদের বক্তব্য, যে সরকার পে কমিশন গঠন করেছে, সেই সরকারই বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশ করতে হবে। এই দাবি জানানোর পাশাপাশি তারা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ না হলে তারা আন্দোলনে নামবেন। পাশাপাশি ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পে কমিশনের সুপারিশ জমা না পড়লে কঠোর পদক্ষেপের হুমকিও দিয়েছেন তারা।
পরিস্থিতি এভাবে জটিল হওয়ার পরও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যেও নতুন স্কেল বাস্তবায়নের সদিচ্ছা রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত ২৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে জাতীয় বেতন কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে পে স্কেল প্রণয়নের সার্বিক অগ্রগতি, বিভিন্ন গ্রেডের বেতন কাঠামো, ভাতা সমন্বয় এবং অন্যান্য সুবিধা পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। এর আগে ২৬ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় জনপ্রশাসন, ভূমিসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দফার বৈঠক হয়েছিল ২৪ নভেম্বর, যেখানে কমিশনের সদস্যরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মূলত বেতন কাঠামোর কাঠামোগত রূপরেখা ও সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। বৈঠক শেষে কমিশনের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, আলোচনাগুলো ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ হলেও সব সচিব উপস্থিত হতে পারেননি, তাই আরও একটি বৈঠক প্রয়োজন হবে। তিনি আরও জানান যে আলোচনা শেষ হলেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুপারিশ চূড়ান্ত করে রিপোর্ট জমা দেওয়া সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন।
গত জুলাইয়ের শেষ দিকে সরকার সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে সভাপতি করে ২৩ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ গঠন করে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ ছিল, কমিশন প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে। দীর্ঘ আট বছরের ব্যবধানে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো তৈরির উদ্যোগটি নেওয়া হয়, যেটি সরকারি চাকরিজীবীদের মাঝে দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশিত ছিল। এর আগে ১ থেকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সাধারণ নাগরিক, সরকারি–স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের কাছ থেকে অনলাইনে মতামত সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি দুই শতাধিক কর্মচারী সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময়ও করেছে কমিশন।
তবে পরিস্থিতি আরও পরিবর্তিত হয় যখন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রথমে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে বর্তমান সরকারের মেয়াদেই নতুন পে স্কেল কার্যকর করা হবে, কিন্তু পরে তার অবস্থান পাল্টে বলেন যে নির্বাচিত সরকারই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তার এই মন্তব্য সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। সচিবালয়ের কর্মকর্তা–কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি বাদিউল কবির বলেন, যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকারই পে কমিশন গঠন করেছে, তাই এই সরকারের দায়িত্বই পে স্কেল কার্যকর করা। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সুপারিশ না পেলে তারা কমিশনের ওপর চাপ বৃদ্ধি করবেন এবং প্রয়োজনে বৃহত্তর কর্মসূচিতেও যাবেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে নতুন পে স্কেল ঘোষণা হলেই সাধারণত বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়, যা অন্য খাতের কর্মচারীদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়। তবে সরকারি কর্মচারীদের একই বেতন কাঠামোতে এক দশক কাটানো, মূল্যস্ফীতির ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি এবং ক্রয়ক্ষমতার পতনের কারণে বেতন বৃদ্ধি এখন অত্যাবশ্যক। যদিও দেশ এখন রাজস্ব সংকট, নিম্ন কর–জিডিপি অনুপাত, ধীরগতির অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও কমতে থাকা প্রবৃদ্ধির চাপে রয়েছে—তাই অন্তর্বর্তী সরকার হয়তো এই বড় ব্যয়ের দায়িত্ব নতুন সরকারের ওপর দিতে চাইছে।
ইতিমধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন নতুন পে স্কেলের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। ১৪ নভেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে সমাবেশ করে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারি দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ ঘোষণা দেয় যে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে গেজেট প্রকাশ করতে হবে এবং ১ জানুয়ারি থেকে নতুন পে স্কেল কার্যকর করতে হবে, অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। সরকারি কর্মচারী কল্যাণ ফেডারেশন জানিয়েছে যে তাদের নেতৃত্বে ১২টি সংগঠন ইতোমধ্যে আন্দোলনের জন্য জোটবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে আছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছয়টি শিক্ষক সংগঠন, ১১–২০ গ্রেড সরকারি চাকরিজীবী ফোরাম, কর্মচারী উন্নয়ন ফোরাম, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী সমিতি, রেলওয়ে এমপ্লয়িজ লীগসহ আরও কয়েকটি সংগঠন। তারা জানিয়েছেন, দাবি না মানা হলে জেলা–জেলায় বিক্ষোভ, ঢাকায় মহা-সমাবেশ, অবস্থান কর্মসূচি এবং কর্মবিরতির মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
কর্মচারী কল্যাণ ফেডারেশনের মুখপাত্র আব্দুল মালেক বলেন, কর্মচারীদের মধ্যে আস্থার সংকট কাটাতে হলে ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন স্কেলের গেজেট প্রকাশ করতে হবে। প্রয়োজনে সরকার চাইলে ১ জানুয়ারি থেকে নতুন স্কেল কার্যকর করে পরবর্তী অর্থবছরে ছয় মাসের এরিয়ার বকেয়া পরিশোধ করতে পারে—কিন্তু নতুন পে স্কেল ঘোষণা করা ছাড়া পরিস্থিতি আর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। অন্যদিকে কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর বাদিউল কবির জানান, চেয়ারম্যান জানিয়েছেন যে তারা ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই একটি রিপোর্ট দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন এবং কর্মচারীদের দাবিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছেন।
Leave a Reply