বরাবরের মতোই জাতীয় নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসতেই এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বড় একটি অংশ আবারও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে প্রকাশ্য প্রচারণায় সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। অথচ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এই একই শিক্ষক-কর্মচারীরাই আবার প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, বা পোলিং অফিসার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ফলে তারা একদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের মতো প্রায় সব সুবিধা উপভোগ করলেও অন্যদিকে “বেসরকারি’’ পরিচয় বহন করে রাজনীতিসহ নানা পেশায় অনায়াসে যুক্ত হতে পারেন। এই অবস্থান থেকে তাঁরা বহু বছর ধরে রাজনৈতিক দলের কর্মী, নোট–গাইড ব্যবসায়ী, কোচিং উদ্যোক্তা—এমনকি সাংবাদিকতার মতো মহৎ পেশাকেও নানাভাবে কলুষিত করে তুলছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিগত কয়েক বছরে প্রশাসনিক কাঠামোতেও তাদের আচরণে পরিবর্তন এসেছে বলে অভিযোগ শোনা যায়। এখন বহু এমপিওভুক্ত শিক্ষক এসপি, ওসি, ডিসি, এমনকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদেরও অতিরিক্ত শ্রদ্ধাসূচক সম্বোধন করেন—যা অতীতে দেখা যেত না। এর ফলে প্রকৃতভাবে পাঠদানে নিবেদিত শিক্ষকরা দ্বৈত পেশায় যুক্ত এই শিক্ষকদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। এমনকি দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসকও একাধিকবার সরকারকে সুপারিশ করে বলেছেন, এমপিও শিক্ষকদের শিক্ষা–বহির্ভূত কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে না আনলে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পরবে।
সর্বশেষ, জেলা প্রশাসকরা প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগে দাবি তুলেছেন—সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ার সুযোগ অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন।
১৮ নভেম্বর সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় ৬৪ জেলার ডিসি এবং আট বিভাগের বিভাগীয় কমিশনাররা অংশ নেন। বৈঠকের একাধিক সূত্র জানায়, সভায় রাজশাহী বিভাগের একজন জেলা প্রশাসক স্পষ্টভাবে জানান, এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা বর্তমানে মূল বেতনের পুরো পরিমাণই সরকার থেকে পান। সরকারের অংশের পাশাপাশি তারা সামান্য কিছু ভাতাও উপভোগ করেন। জাতীয় নির্বাচন এলে তারা কেন্দ্রের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ন্ত্রণকারী প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বা পোলিং অফিসার হন। কিন্তু রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রকাশ্যে প্রচারণায় তাদের ভূমিকা থাকলে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা তৈরি হতে পারে।
ডিসিরা আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, এর আগেও—২০২৩ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে—এমপিওভুক্তদের জন্য সরকারি কর্মচারী আচরণবিধির মতো একটি সুনির্দিষ্ট বিধিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। যুক্তি ছিল, এমপিওভুক্তরা বেসরকারি পরিচয়ে সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান, যা পাঠদানে তাদের উদাসীনতার কারণ হয় এবং অনেকে ঠিকাদারি, সাংবাদিকতা বা অন্যান্য পেশাতেও যুক্ত হন। বিধিমালা থাকলে এসব প্রবণতা কমবে এবং শিক্ষকরা তাদের মূল দায়িত্বে আন্তরিক হতে বাধ্য হবেন। কিন্তু সে সময় সরকার এই বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।
সভায় ঝিনাইদহের তৎকালীন ডিসি মনিরা বেগমের পুরোনো প্রস্তাবও নতুন করে আলোচনায় আসে—যেখানে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য সরকারি কর্মচারীর ন্যায় নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ করলে শিক্ষকতা পেশায় শৃঙ্খলা, পেশাগত নিষ্ঠা এবং নিরপেক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব শেখ আব্দুর রশীদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে পরিকল্পনা উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা রহমান খান, আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলসহ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
সভায় দুজন জেলা প্রশাসক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বন্দ্ব বাড়ছে। তাই জাতীয় সংসদ নির্বাচন আচরণবিধিতে “ওয়াজ মাহফিলে রাজনৈতিক বক্তব্য নিষিদ্ধ’’ করার বিধান যোগ করা উচিত। নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ এ বিষয়ে বলেন—প্রস্তাবটি যথেষ্ট যৌক্তিক। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা পান, তাই তারা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রচারে যেতে পারবেন কি না—এটা নির্বাচন কমিশন পর্যালোচনা করবে। যদি বিদ্যমান কন্ট্রাক্ট রুলে নিষেধাজ্ঞা থাকে তবে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হবে; না থাকলে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, ওয়াজ মাহফিলের অনুমতি দেওয়ার সময় স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক আলোচনা নিষিদ্ধ করার শর্ত যুক্ত করা উচিত।
সভায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এবারের নির্বাচন প্রচলিত ধারার নির্বাচন নয়—বরং “দেশ রক্ষার নির্বাচন”। এই নির্বাচন কেবল পাঁচ বছরের সরকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া নয়; গণভোট সংযুক্ত হওয়ায় এর গুরুত্ব অসীম। তিনি জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে স্পষ্ট করে বলেন—এই নির্বাচন গণঅভ্যুত্থানের পূর্ণতা দেবে এবং দেশের আগামী শতাব্দীর গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করবে। তাই কোনো জেলারই ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই। জেলা প্রশাসকদের দায়িত্ব হবে “ধাত্রীর ভূমিকা” নিয়ে নির্বাচনকে নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করা।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক তরুণ ও নারী ভোটার রয়েছেন, যারা গত ১৫ বছরে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এবার তারা আগ্রহের সঙ্গে ভোট দিতে প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও গভীরভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। তাই সবক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ সততা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
Leave a Reply