বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বহুল প্রত্যাশিত বদলি প্রক্রিয়া অবশেষে শুরু করতে চলেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বহুবছর ধরে অচলাবস্থায় থাকা এই ব্যবস্থা পুনরায় চালু করতে সরকার নতুন সফটওয়্যার তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান বদলি নীতিমালায় ব্যাপক সংশোধনী আনার উদ্যোগ নিয়েছে। সংশোধনের অংশ হিসেবে সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবটি দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)—যেটি বলছে, নিজ জেলায় কর্মরত শিক্ষকদের বদলির আওতায় না আনা উচিত। এই প্রস্তাব শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন এমন বৈষম্যমূলক বিধান যুক্ত করা হচ্ছে? এবং নীতিমালার উদ্দেশ্যই বা কীভাবে এর দ্বারা পূরণ হবে? তাহলে মাউশি কি চায় না? যে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বদলি আওতায় আসুক। মাউশি যদি এভাবে এধরনের আচরণ প্রতিনিয়ত করতে থাকে তাহলে কিন্তু মাউশির ভুমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়। কেন জানিনা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সকল বিষয়ে মাউশির সকল সময় নেগেটিভ মনোভাব শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির একটি প্রধান অন্তরায় হিসাবে আবির্ভুত হচ্ছে সকল সময়।
সোমবার (১৭ নভেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে যা জানা গিয়েছে তা হলো, পূর্বের নীতিমালায় “নিজ জেলার মধ্যে বদলি করা যাবে কি যাবে না”—এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না। এই অস্পষ্টতার কারণে ভবিষ্যতে জটিলতা ও প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন। তাই নতুন নীতিমালায় বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার লক্ষ্যে মাউশির পক্ষ থেকে এই প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানতে অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-২) মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, মাউশি মনে করছে—যদি নিজ জেলায় কর্মরত শিক্ষকদেরও বদলির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে বদলি ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। তাদের যুক্তি, বহু শিক্ষক আছেন যাঁরা নিজেদের জন্মস্থান বা জেলা থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে কর্মরত, এবং সেই শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে বদলি সুবিধার জন্য অপেক্ষা করছেন। ফলে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত তাদের, যারা পরিবার ও কর্মস্থলের দূরত্বজনিত বাস্তব সমস্যায় ভুগছেন।
শিক্ষকদের আরেকটি যুক্তি হলো—বাংলাদেশের কিছু জেলায় একই জেলার ভেতরে এক উপজেলা থেকে আরেক উপজেলায় যেতে ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। অপরদিকে পাশের কোন জেলাতেই দূরত্ব মাত্র ১০ থেকে ২০ কিলোমিটার। তাহলে সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র সীমারেখা হিসেবে জেলার নাম আলাদা হওয়ায় কোনো শিক্ষক কেন বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন? সরকারি কর্মকর্তার ব্যাখ্যা ছিল—নিজ জেলার শিক্ষক বদলি বিষয়ে পূর্বের নীতিমালায় কিছু বলা নেই, তাই মাউশি প্রস্তাব করেছে; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে।
বদলি নীতিমালায় পরিবর্তন আনার পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট রয়েছে। এনটিআরসিএ কর্তৃক সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকরা নিয়োগ পাওয়ার পর অনেকেই বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠানে রয়ে যান। ফলে তাদের পেশাগত বিকাশ, দক্ষতা বিনিময় ও অভিজ্ঞতা বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে স্থবিরতা তৈরি হয়। এই সমস্যা দূর করতে সরকার স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বদলি ব্যবস্থার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু সফটওয়্যারের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হওয়ায় প্রথম দফায় উদ্যোগটি থেমে যায়। পরে ইনডেক্সধারী শিক্ষকরা রিট দায়ের করলে আদালতের স্থগিতাদেশে দ্বিতীয় দফার উদ্যোগও অচল হয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন—এবারের উদ্যোগেই সম্ভবত সব জটিলতা কাটিয়ে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষক বদলি ব্যবস্থা বাস্তবায়নের দ্বার খুলতে যাচ্ছে। সেখানে মাউশি কেন বিভিন্ন সময়ে নানাধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করার উদ্দেশ্য কিন্তু নানা মুখী প্রশ্নের সৃষ্টি করছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মনের মাঝে। তাহলে কি ধরে নেওয়া যায় মাউশি কি যে কোন উপায়ে চাচ্ছে যাতে এই এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের বদলি যে কোন উপায়ে বন্ধ করতে। চলমান কর্মশালা, সফটওয়্যার প্রস্তুতি ও নীতিমালা সংশোধনের কাজ শেষ হলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্য বহু প্রতীক্ষিত এই বদলি ব্যবস্থা শুরু হওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
Leave a Reply