সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে ২০২৬ সালের শুরুতেই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ নিজেও কয়েক দফা সংবাদ মাধ্যমে জানিয়েছেন—জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর করা হবে, এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ গতকাল (রোববার, ৯ নভেম্বর) তিনি সেই বক্তব্য থেকে সরে এসে জানান, “আগামী সরকারই হয়তো নতুন পে-স্কেল কার্যকর করবে।”
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “একটা পে কমিশনের ব্যাপার আছে। সেটা আমরা এখন কিছু বলতে পারি না। দেখা যাক কতদূর যায়। আগামী সরকার হয়তো সেটা এসে করতে পারে। আমরা যেহেতু ইনিশিয়েট করে ফেলেছি।”
অর্থাৎ, অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে তারা পে কমিশনের কার্যক্রম শুরু করেছেন ঠিকই, তবে সেটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন পরবর্তী সরকারের ওপর পড়ছে।
এর আগে, গত ৩১ অক্টোবর শেষ হয় পে কমিশনের মতামত সংগ্রহের কাজ। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন খাতের নীতি নির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি হওয়ার কথা ছিল।
পে কমিশনের সভাপতি ও সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খান বলেন, “নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমরা সুপারিশ জমা দিতে পারব। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি, এবং কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় এনে আমরা বাস্তবসম্মত প্রস্তাব রাখব।”
অর্থাৎ, সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা পড়বে এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর হবে। কিন্তু অর্থ উপদেষ্টার নতুন মন্তব্যে পুরো প্রক্রিয়াটিই এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেই নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা উচিত ছিল।
একজন জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় আছি। অন্তর্বর্তী সরকারই যদি দায়িত্ব নিয়ে না করে, তাহলে আমাদের আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?”
সরকারি কর্মচারীদের সংগঠনগুলোও ইতিমধ্যে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার আল্টিমেটাম দিয়েছিল। এখন তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে কর্মসূচি নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ কেউ ধর্মঘট বা কর্মবিরতির মতো পদক্ষেপের কথাও ভাবছেন।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ হলো রাজস্ব ঘাটতি ও আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন,
“সরকারি কর্মকর্তাদের একটি নতুন বেতন কাঠামো চাওয়া সম্পূর্ণ যৌক্তিক। কিন্তু সরকারের আর্থিক অবস্থার অবনতি এতটাই স্পষ্ট যে তারা তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। পে-স্কেল বাস্তবায়নের দায়িত্ব পরবর্তী সরকারের দিকে ঠেলে দেওয়াই প্রমাণ করে যে বর্তমান সরকার কার্যত হাত তুলে দিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের অনেক আশা ছিল। তারা মনে করেছিল এই সরকার প্রশাসনিক সংস্কার, বেতন কাঠামোর আধুনিকায়ন, এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।”
অন্যদিকে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন,
“সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের পরিমাণ, এবং সুদ পরিশোধের চাপ এতটাই বেড়ে গেছে যে, আয় দিয়ে কুলিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। এই অবস্থায় নতুন পে-স্কেল কার্যকর করা অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এমনকি পরবর্তী সরকারের জন্যও এটা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।”
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা যে বেতন কাঠামোতে আছেন, সেটি ২০১৫ সালে কার্যকর হওয়া অষ্টম পে-স্কেল। এরপর প্রায় এক দশক কেটে গেছে। এ সময়ের মধ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ, জীবনযাত্রার ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
নতুন কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, অনেক কর্মকর্তা ৮০-১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির আশা করেছিলেন। কিন্তু এখন সেই আশাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন পে-স্কেল কার্যকর না হলে শুধু কর্মচারীদের হতাশাই বাড়বে না, প্রশাসনিক কর্মদক্ষতাও কমে যাবে।
তারা মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার যদি এই প্রক্রিয়াটি শেষ না করে, তাহলে পরবর্তী সরকারের সামনে আরও বড় অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, সরকারি চাকরিজীবীদের বহু প্রতীক্ষিত নতুন পে-স্কেল এখন কার্যত ঝুলে গেছে। একদিকে সরকারের আর্থিক সংকট, অন্যদিকে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এই সিদ্ধান্তের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আগামী সরকারের হাতে।
Leave a Reply