সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়ন ও চূড়ান্ত করার কাজে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা চলছে পে কমিশনের সদস্যদের মধ্যে। দীর্ঘদিন পর নতুন পে স্কেল প্রবর্তনের লক্ষ্যে এই কমিশন গত ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি কর্মচারী সংগঠন, সমিতি ও অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময় করেছে। এসব মতামত সংগ্রহের পর এখন তারা সব প্রস্তাব ও দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে একটি চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
পে কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এবার বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব আসছে। নতুন স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে কমিশন। দশ বছর ধরে নতুন কোনো পে স্কেল না পাওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। একাধিকবার তারা বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনও করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে সরকারকেও নানা চাপের মুখে পড়তে হয়েছে, বিশেষ করে নির্বাচনের আগে চাকরিজীবী শ্রেণির দাবির প্রতি সংবেদনশীল হতে হচ্ছে সরকারের।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ৮২ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরে এই ব্যয় আরও প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮৪ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা। কিন্তু নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারের ব্যয় বেড়ে যেতে পারে অতিরিক্ত ৬৫ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত, যা সরকারের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
পে কমিশনের সদস্যরা জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে শুধু প্রস্তাব নয়, অতিরিক্ত অর্থের উৎস সম্পর্কেও ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। কারণ, রাজস্ব আহরণ না বাড়লে এত বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ জোগাড় করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রুমানা হক মনে করেন, উচ্চহারে বেতন বাড়ানো হলে তা দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, “বেতন বাড়ালে শুধু মূল বেতনই নয়, বোনাস, পেনশন এবং অন্যান্য ভাতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে। এতে সরকারের বার্ষিক বাজেট ঘাটতি আরও বাড়বে।” তার মতে, বেতন বৃদ্ধি যুক্তিযুক্ত হলেও সব খাতের জন্য সমানভাবে বাড়ানো উচিত নয়; বরং কর্মদক্ষতা, কর্মপরিধি ও কর্মফল বিবেচনা করে ভিন্নভিন্ন হারে বৃদ্ধি করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক জটিলতা ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি করাও জরুরি।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী এই বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তার মতে, বেতন দ্বিগুণ করলেও সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে না, কারণ সরকার এই ব্যয়ের একটি অংশ আয়করের মাধ্যমে ফেরত পাবে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “যদি সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ করা হয়, তাহলে নিম্ন ও মধ্যস্তরের অনেক কর্মচারীই করদাতার আওতায় চলে আসবে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকার যদি এই অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংক থেকে ধার নিয়ে বা টাকা ছেপে জোগান দেয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। এতে বেতন বাড়ানোর প্রকৃত সুফল কর্মচারীরা পাবে না, কারণ ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে।
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি মানুষ আয়করের আওতার বাইরে রয়েছে। যদি এই গোষ্ঠীকে করদাতা করা যায় এবং ধনীদের মধ্যে ভ্যাট ফাঁকি রোধ করা যায়, তাহলে অতিরিক্ত বেতন ব্যয়ের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ সরকারের হাতে আসবে।” তার মতে, দুর্নীতি দমন ও ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করলেই সরকার নতুন বেতন কাঠামো সহজেই বাস্তবায়ন করতে পারবে।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বেতন-ভাতা দ্বিগুণ করা সরকারের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, “আমাদের অর্থনীতি এখনো স্থিতিশীল অবস্থায় পুরোপুরি ফিরতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে বেতন ৭০-৭৫ শতাংশের বেশি বাড়ানো সম্ভব নয়।” তিনি আরও বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার এখন নির্বাচনের আগে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছে। একদিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীদের দাবিদাওয়ার চাপ—এই দুই চাপ মোকাবিলায় সরকার হয়তো উন্নয়ন বাজেট কমিয়ে বেতন বৃদ্ধির অর্থ জোগানোর কথা ভাবতে পারে।”
তবে তিনি মনে করেন, সরকার শেষ পর্যন্ত হয়তো এই পে স্কেল রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই ব্যবহার করতে পারে। কারণ, সময় খুবই সীমিত—ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পে কমিশনের মেয়াদ, আর নির্বাচনও ফেব্রুয়ারিতেই হওয়ার কথা। ফলে কমিশন প্রস্তাব দিলেও বাস্তবায়নের দায়িত্ব নতুন নির্বাচিত সরকারের ওপর ঠেলে দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
অধ্যাপক আইনুল ইসলাম আরও সতর্ক করে বলেন, “আমাদের বৈদেশিক পরিস্থিতিও এখন অনুকূলে নয়। ভিসা রেস্ট্রিকশন, বিদেশে কর্মসংস্থান হ্রাস, রেমিট্যান্সে চাপ—এসব কারণে রিজার্ভে প্রভাব পড়ছে। ফলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের মুদ্রাস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়বে।” তার মতে, “কমিশনের সুপারিশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, রাজস্ব বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকার—সবকিছু বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।”
সারসংক্ষেপে বলা যায়, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি হলেও, তা বাস্তবায়নে সরকারের সামনে রয়েছে কঠিন অর্থনৈতিক সমীকরণ। একদিকে কর্মচারীদের যৌক্তিক দাবি, অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই নতুন সরকারের জন্য টেকসই ও বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
Leave a Reply