বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির নীতিমালায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ চার বছরের বেশি সময় পর এই নীতিমালায় এমন পরিবর্তন আসছে, যা একদিকে যেমন শিক্ষক-কর্মচারীদের পদোন্নতির নতুন সুযোগ তৈরি করবে, অন্যদিকে এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়াকেও সহজ করবে। সংশোধিত নীতিমালার লক্ষ্য হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষক প্রশাসনকে আরও কাঠামোবদ্ধ ও বাস্তবসম্মত করা। আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের সভাপতিত্বে চূড়ান্ত সভা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে নতুন নীতিমালার অনুমোদন দেওয়া হতে পারে।
২০২১ সালের মার্চে প্রণীত বর্তমান নীতিমালায় উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে “জ্যেষ্ঠ প্রভাষক” পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে এই পদ সৃষ্টির পর পদোন্নতির কাঠামো অচল হয়ে পড়ে। কারণ, এই পদে উন্নীত হওয়ার পর শিক্ষকদের পরবর্তী কোনো উচ্চ পদে ওঠার সুযোগ ছিল না। নতুন সংশোধনীতে এই পদ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হচ্ছে এবং তার পরিবর্তে “সহকারী অধ্যাপক” পদ যুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘদিন পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত প্রভাষকরা আবারও উচ্চপদে উন্নীত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত প্রভাষকরা অন্তত আট বছর সন্তোষজনক চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জনের পর পারফরম্যান্স মূল্যায়ন সূচকে ১০০ নম্বরের মধ্যে নির্ধারিত মানে উত্তীর্ণ হলে, প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত মোট পদের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতে পারবেন। যারা এই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হবেন না, তারা চাকরিতে ১০ বছর পূর্তিতে জাতীয় বেতন স্কেলে গ্রেড-৯ থেকে গ্রেড-৮-এ উন্নীত হবেন। আর যারা ধারাবাহিকভাবে ১৬ বছর এমপিওভুক্ত অবস্থায় থেকে শিক্ষকতা চালিয়ে যাবেন, তারাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সহকারী অধ্যাপক পদে উন্নীত হবেন। এ পদের বেতন স্কেল হবে গ্রেড-৬, যা পূর্বের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদের সমান।
অধ্যক্ষ পদের যোগ্যতার ক্ষেত্রেও আসছে বড় পরিবর্তন। আগের নীতিমালায় অধ্যক্ষ পদে আবেদন করতে পারতেন কেবল এমপিওভুক্ত উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় বা কলেজের অধ্যক্ষ, ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ, ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক বা জ্যেষ্ঠ প্রভাষকরা, যাদের অন্তত তিন বছরের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছিল। নতুন নীতিমালায় এখন যোগ হয়েছে আরও একটি ধারা—স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর বা চার বছর মেয়াদি স্নাতক ডিগ্রিধারী (সমগ্র শিক্ষাজীবনে একটির বেশি তৃতীয় বিভাগ নয়) প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকরা নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অধ্যক্ষ পদের জন্য আবেদন করতে পারবেন। প্রধান শিক্ষক হিসেবে অন্তত দুই বছর দায়িত্ব পালন ও ১৩ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকলে, কিংবা সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিন বছরের অভিজ্ঞতাসহ ১৫ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকলেও আবেদন করা যাবে।
এছাড়া, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের যোগ্যতাতেও পরিবর্তন আসছে। আগে ইনডেক্সধারী প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক বা নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা তিন বছরের অভিজ্ঞতাসহ ১৫ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকলে নিয়োগের যোগ্য ছিলেন। নতুন সংশোধনীতে বলা হয়েছে, এখন সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে অন্তত তিন বছরের অভিজ্ঞতাসহ মোট ১৭ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকলেও প্রধান শিক্ষক পদে আবেদন করা যাবে। এতে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করে নেতৃত্বের সুযোগ না পাওয়া সিনিয়র শিক্ষকদের জন্য নতুন দুয়ার খুলবে।
এমপিওভুক্তির শর্তও শিথিল করার প্রস্তাব রয়েছে সংশোধিত নীতিমালায়। বর্তমানে কোনো স্কুল বা কলেজ এমপিওভুক্ত হতে হলে নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী ও পাসের হার বজায় রাখতে হয়। নতুন নীতিমালায় গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই মানদণ্ড কিছুটা কমানো হতে পারে, যাতে তারা এমপিও তালিকাভুক্ত হতে পারে। তবে শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে মানদণ্ড কিছুটা কঠোর রাখা হবে, যেন মানসম্মত শিক্ষা বজায় থাকে।
অন্যদিকে, দেশের অনার্স ও মাস্টার্স কলেজগুলোকে এমপিও তালিকার আওতায় আনার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। বহু অনার্স-মাস্টার্স কলেজ সরকার অনুমোদিত হলেও এখনো এমপিও সুবিধা পায়নি। সংশোধনী সভায় এই বিষয়েও সিদ্ধান্ত হতে পারে, যা কার্যকর হলে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের হাজারো শিক্ষক-কর্মচারী সরকারি ভাতার আওতায় আসবেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-২) মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, “বর্তমান এমপিও নীতিমালার কিছু বিষয় সময়ের সঙ্গে অসঙ্গত হয়ে পড়েছে। এখন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কিছু সংশোধন আনা প্রয়োজন।” তিনি বলেন, “সভায় কী সিদ্ধান্ত হয় তা আগে বলা সম্ভব নয়। রেজ্যুলেশন প্রকাশের পরই বিস্তারিত জানানো যাবে।”
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা জানান, “নীতিমালা সংশোধনের বিষয়ে ইতোমধ্যে তিনটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামীকালকের সভাটি হবে চূড়ান্ত। এখানে পদোন্নতি কাঠামো, নিয়োগযোগ্যতা এবং এমপিওভুক্তির মানদণ্ড বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
সব মিলিয়ে, নতুন এমপিও নীতিমালা শিক্ষা প্রশাসনের কাঠামোয় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। এতে শিক্ষকরা পেশাগত উন্নতির নতুন সুযোগ পাবেন, নেতৃত্বের পর্যায়ে যোগ্যতার বিস্তার ঘটবে, এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও সরকারের সহায়তার আওতায় আসতে পারবে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও শিক্ষকবান্ধব হয়ে উঠবে।
Leave a Reply