স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্তকরণ ফাইলে প্রধান উপদেষ্টার স্বাক্ষর
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশের স্বীকৃতপ্রাপ্ত এক হাজার ৮৯টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসাকে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সরকারের এই সিদ্ধান্তে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনাটি বহুদিন ধরে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। অবশেষে প্রধান উপদেষ্টা নিজ হাতে ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন, যা এই পর্যায়ের চূড়ান্ত প্রশাসনিক অনুমোদন হিসেবে বিবেচিত।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১,০৮৯টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসাকে এমপিওভুক্ত করার প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়ে ঝুলে ছিল। এর আগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন থেকে ইবতেদায়ী পর্যায়ের শিক্ষার অনেকাংশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আওতায় আসার পর এই প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকরা এমপিওভুক্তির দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কয়েক দফা যাচাই-বাছাই শেষে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ তালিকাটি চূড়ান্ত করে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে প্রেরণ করে। সোমবার (৩ নভেম্বর) সেই ফাইলটি প্রধান উপদেষ্টা স্বাক্ষর করেছেন বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্মসচিব (মাদ্রাসা অনুবিভাগ) এস. এম. মাসুদুল হক বলেন, “স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্তির ফাইলে প্রধান উপদেষ্টা স্বাক্ষর করেছেন বলে আমরা জেনেছি। এখন ফাইলটি যখন আমাদের কাছে আসবে, তখন শর্ত ও নির্দেশনাসহ বিস্তারিত জানা যাবে।”
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “আমরা ১,০৮৯টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার এমপিওভুক্তির ফাইল প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে পাঠিয়েছিলাম। প্রধান উপদেষ্টা ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন, তবে এর সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্তও সংযুক্ত করা হয়েছে। যেমন—প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া, শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার, পরিদর্শন রিপোর্ট এবং শিক্ষার মান যাচাই করে এমপিও সুবিধা কার্যকর হবে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এখন ফাইলটি শিক্ষা উপদেষ্টার দপ্তরে যাবে। বর্তমানে শিক্ষা উপদেষ্টা দেশের বাইরে রয়েছেন, তিনি আগামী ৭ নভেম্বর দেশে ফিরবেন। এরপর ফাইলটি আমাদের হাতে এলে আমরা দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করার উদ্যোগ নেব। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহেই প্রজ্ঞাপন প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।”
এ সিদ্ধান্তে দেশের প্রায় বিশ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর মুখে হাসি ফুটেছে। তারা মনে করছেন, বহু বছর ধরে বেতন-বোনাস ও আর্থিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত থাকার পর অবশেষে তাদের দাবির ন্যায্য স্বীকৃতি মিলছে। শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় মাদ্রাসা খাতে শিক্ষক সংকট দূর হবে, মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ গড়ে উঠবে এবং জাতীয় শিক্ষানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যও রক্ষা পাবে।
অন্যদিকে, বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন প্রধান উপদেষ্টার এই পদক্ষেপকে “ঐতিহাসিক” আখ্যা দিয়ে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলছেন, ফাইলটি এখন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অল্প কয়েক ধাপ দূরে রয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারি হলে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষকরা এমপিও সুবিধার আওতায় আসবেন, যার ফলে তারা সরকারি অনুদানভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের মতোই নিয়মিত বেতন, ইনক্রিমেন্ট ও অবসরভাতা সুবিধা পাবেন।
সব মিলিয়ে, অন্তর্বর্তী সরকারের এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের প্রাথমিক মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
Leave a Reply