বৈষম্যের কালো অধ্যায়: এমপিও শিক্ষকদের বিএড আইন বাতিল না হওয়ার আসল গল্প
দেশে শিক্ষা খাতের উন্নয়ন নিয়ে বড় বড় স্লোগান শোনা যায় প্রতিদিন—“শিক্ষক জাতির মেরুদণ্ড”, “গুণগত শিক্ষা চাই”, “শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ”—এইসব বুলি যেন কাগজের পাতায় বা সভার ব্যানারে সীমাবদ্ধ। বাস্তবের চিত্রটা ভয়াবহভাবে বৈষম্যমূলক, নিষ্ঠুর এবং হতাশাজনক। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সেই বৈষম্যের সবচেয়ে বড় শিকার। বহুদিন ধরে “বিএড বাধ্যতামূলক” নামে যে আইন চালু আছে, তা এখন শিক্ষকদের চোখে এক অমানবিক কালো আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কারণ, এই আইনের কারণে তারা সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় সব দিক থেকে বঞ্চিত—বেতন, মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা—সব জায়গায় তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো আচরণ পান।
এই আইন বাতিল না হওয়ার পেছনে কোনো জটিল কাঠামোগত সমস্যা নেই, নেই কোনো প্রযুক্তিগত জটিলতা; মূল কারণ মাত্র ১৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, রাষ্ট্র যদি বছরে এই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিত, তবে এমপিও শিক্ষকদেরও সরকারি শিক্ষকদের মতো সমান মর্যাদার বেতন কাঠামো দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়—দুই কর্তৃপক্ষই সেই বরাদ্দ দিতে রাজি হয়নি। যেন শিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মান আর ন্যায্য বেতন তাদের কাছে কোনো গুরুত্বই রাখে না। অথচ অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার অব্যবহৃত বাজেট পড়ে থাকে, প্রজেক্টে অপচয় হয় অগণিত, কিন্তু শিক্ষকদের প্রাপ্য টাকা দিতে রাষ্ট্রের গা শিউরে ওঠে!
এখন প্রশ্ন হলো—যেখানে সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা বিএড ছাড়াই চাকরির শুরুতেই ১০ম গ্রেডে যোগ দেন, সেখানে বেসরকারি এমপিও শিক্ষকরা বিএড সনদ না থাকলে ১১তম স্কেলে আটকে থাকেন। এই এক ধাপের ফারাকই পুরো ব্যবস্থার বৈষম্যের প্রতীক। কেউ কেউ হয়তো বলবেন—“বিএড তো শিক্ষকতার যোগ্যতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ, তাই বাধ্যতামূলক।” ঠিক আছে, কিন্তু একই রাষ্ট্রের দুই ধরনের শিক্ষক—একজন সরকারি, অন্যজন বেসরকারি—কেন একই নিয়মের আওতায় আসবেন না? কেন এক পক্ষের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ছাড়াও উচ্চ স্কেল, আর অন্য পক্ষের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ না থাকলে শাস্তিমূলক নিম্ন স্কেল? এটাই তো প্রকৃত বৈষম্য, এটাই তো “কালো আইন”!
এই বৈষম্যের ফল ভয়াবহ। যোগ্য, মেধাবী তরুণেরা শিক্ষকতা পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কারণ তারা দেখছেন—এই পেশায় যতই পরিশ্রম করুন, যতই নিবেদন দিন, শেষমেষ আপনি সম্মান নয়, বঞ্চনাই পাবেন। শিক্ষকতা এখন আর গৌরব নয়—হয়ে উঠছে এক প্রকার দণ্ড। আর এই দণ্ডের মূল নকশা তৈরি করছে নীতিনির্ধারকেরা নিজেরাই।
বিষয়টি টাকা নয়, এটা মানসিকতার প্রশ্ন। প্রশাসনের হাতে ক্ষমতা, কিন্তু সেই ক্ষমতার সঙ্গে নেই ন্যায্যতার মনোভাব। তারা চাইলেই বিএড আইন সংস্কার বা বাতিল করে এমপিও শিক্ষকদের মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু তারা দেন না—কারণ তাদের কাছে শিক্ষক মানে নিচু শ্রেণির কর্মচারী, যিনি আদেশ পালন করবেন কিন্তু দাবি তুলবেন না। এই মনোভাবই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
এভাবে বছরের পর বছর বৈষম্য জমতে জমতে এখন এক অদৃশ্য আগ্নেয়গিরি তৈরি হয়েছে। শিক্ষকরা এখনও নীরব, কারণ তারা জানেন—বিক্ষোভে নামলে হয়তো চাকরি যাবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, নীরবতারও একটা সীমা আছে। একদিন এই জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হবে। তখন সেই বিস্ফোরণের ধাক্কা শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তর কাঁপিয়ে দেবে।
আজ যারা ১৫০০ কোটি টাকার জন্য এই আইন বাতিলের বিরোধিতা করছেন, তারা বুঝতে পারছেন না—এই সামান্য অর্থের জন্য তারা হারাচ্ছেন লক্ষ তরুণের শিক্ষার মান, শিক্ষকের মনোবল, এমনকি ভবিষ্যতের মানবসম্পদ। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষ—আর সেই মানুষ গড়ার কারিগরদের অবমূল্যায়ন মানে, নিজেদের ভবিষ্যতকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া।
সুতরাং এখনই সময়—এই বিএড নামক কালো আইন বাতিল করে এমপিও শিক্ষকদের সমঅধিকার নিশ্চিত করা। অন্যথায়, বৈষম্যের এই পাহাড় একদিন ধসে পড়বে, আর তখন কেউ বলতে পারবে না—“আমরা জানতাম না।” কারণ আজ সবাই জানে, সবাই দেখে, তবুও কেউ কিছু করে না। এই নীরব অন্যায়ই একদিন বিদ্রোহের জন্ম দেবে—আর তখন রাষ্ট্রকেও জবাব দিতে হবে সেই প্রশ্নের, “শিক্ষকদের সঙ্গে এমন বৈষম্য কেন?”
Leave a Reply