মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অধীনে পরিচালিত এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (ইএমআইএস) সেলের সার্ভার গত ১৪ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এই সার্ভারের মাধ্যমে দেশের হাজারো বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ইনডেক্স নম্বর, এমপিও আবেদন, পদোন্নতি, পদসংরক্ষণ, বদলি অনুমোদনসহ প্রায় সব প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। দীর্ঘদিন ধরে সার্ভার অচল থাকায় শিক্ষাক্ষেত্রে এক ধরনের প্রশাসনিক স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষক-কর্মচারীরা বলছেন, ইএমআইএস সার্ভার বন্ধ থাকার কারণে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পূর্ণভাবে থেমে গেছে। অনেকে নতুন করে এমপিও আবেদন জমা দিতে পারছেন না, আবার যাদের ইনডেক্স বা নাম সংশোধনের প্রয়োজন ছিল তারাও কাজ এগিয়ে নিতে পারছেন না। অনেকের পদোন্নতি ও ইনক্রিমেন্ট প্রক্রিয়াও ঝুলে আছে। উপজেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ে জমা দেওয়া অনেক ফাইল এখন অচল হয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন এবং প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
রাজধানীর একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক হাফিজুর রহমান বলেন, “আমার এমপিও আবেদন প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। কিন্তু দুই সপ্তাহ ধরে সার্ভারে লগইন করা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই প্রতিষ্ঠানপ্রধান চেষ্টা করছেন, কিন্তু কোনোভাবেই কাজ করা যাচ্ছে না। অথচ আবেদন জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে আমরা খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।”
শুধু এমপিও আবেদন নয়, সার্ভার বন্ধ থাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও নানা সমস্যায় পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়মিত মাসিক তথ্য আপডেট, শিক্ষক উপস্থিতি, ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা, প্রশাসনিক প্রতিবেদনসহ অন্যান্য কাজ করতে পারছেন না। ফলে ইএমআইএস-এর ওপর নির্ভরশীল সমস্ত কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হলে ইএমআইএস সেলের একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন যে, সার্ভার বন্ধ থাকলেও অক্টোবর মাসের বেতন-ভাতা প্রদানে বিলম্ব হবে না। তারা জানান, বিকল্প পদ্ধতিতে বেতন সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও প্রেরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইএমআইএস সেলের এক প্রোগ্রামার বলেন, “আমরা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সময়মতো পৌঁছে দিতে বিকল্প একটি সার্ভার ব্যবহার করছি। সেই সার্ভারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগলেও বেতন প্রদানে বড় কোনো সমস্যা হবে না।”
তবে শিক্ষকদের আশঙ্কা, বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্য প্রেরণ করতে গেলে ভুলভ্রান্তির ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে ইনডেক্স নম্বর, এমপিও সংক্রান্ত ফাইল এবং পদোন্নতি অনুমোদনের মতো জটিল তথ্যগুলোতে ত্রুটি দেখা দিলে তা পরবর্তীতে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।
ইএমআইএস সূত্র জানায়, সার্ভারটি কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) আইটি বিশেষজ্ঞরা সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন। তবে সার্ভার কবে নাগাদ পুনরায় সচল হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি কর্মকর্তারা। ইএমআইএস সেলের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, “সার্ভারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ হার্ডওয়্যার অংশে ত্রুটি ধরা পড়েছে। আমাদের আইটি টিম এবং বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। খুব শিগগিরই সার্ভারটি পুনরুদ্ধার করা হবে বলে আশা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা বুঝতে পারছি শিক্ষক-কর্মচারীরা চরম ভোগান্তিতে আছেন। তাদের স্বার্থ রক্ষায় মাউশি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। সার্ভার পুনরায় সচল না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প ব্যবস্থায় কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”
অন্যদিকে, শিক্ষক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দ্রুত সার্ভার সচল করার দাবি জানানো হয়েছে। তারা অভিযোগ করেছেন, মাউশির সার্ভার প্রায়ই ডাউন হয়ে যায়, যার ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। গত দুই বছরে অন্তত ৬-৭ বার এ ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। শিক্ষকরা মনে করছেন, ইএমআইএস সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণে স্থায়ী টেকনিক্যাল টিম গঠন এবং সার্ভারের নিরাপত্তা ও সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির এক নেতা বলেন, “আমরা বারবার দেখছি, সার্ভার ডাউন হলে সব কাজ থেমে যায়। হাজারো শিক্ষক-কর্মচারীর ফাইল অনিশ্চয়তায় পড়ে থাকে। তাই শুধু সার্ভার মেরামত করলেই হবে না, পুরো সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্ভার নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।”
বর্তমানে দেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় কর্মরত প্রায় ৩ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী ইএমআইএস সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সার্ভার অচল থাকায় এই বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রশাসনিকভাবে এক ধরনের অচলাবস্থায় রয়েছেন। শিক্ষকরা বলছেন, “ডিজিটাল বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রশাসনের এমন অচলাবস্থা কাম্য নয়।” তারা মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন, যাতে দ্রুত সার্ভার সচল করে অনলাইন সেবা স্বাভাবিক করা হয় এবং ভবিষ্যতে যেন এমন স্থবিরতা আর না ঘটে।
Leave a Reply