দেশের সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের পাশাপাশি এখন বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজগুলোতেও দুর্নীতি, অনিয়ম ও আর্থিক স্বচ্ছতার অভাবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। শিক্ষা খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিষয়টি বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও সরকার চাইছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি শক্ত বার্তা দেওয়া, যাতে কেউই নিজেদের আইন বা নিয়মের ঊর্ধ্বে ভাবতে না পারে।
রবিবার (২৬ অক্টোবর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এখন পর্যন্ত দুদক মূলত সরকারি স্কুল, কলেজ ও শিক্ষা দপ্তরগুলোর দুর্নীতি তদন্ত ও অভিযান পরিচালনা করে থাকে। তবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজগুলোতেও দীর্ঘদিন ধরে নানাবিধ অনিয়ম চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের নিয়োগে ঘুষ, ভুয়া উপস্থিতি দেখিয়ে বেতন তোলা, সরকারি বরাদ্দের অপব্যবহার, প্রশাসনিক অনুমোদনে জালিয়াতি, এমনকি অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের তহবিল ব্যবহারে অস্বচ্ছতা—এসব অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে।
তিনি বলেন, “বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও সরকার থেকে নিয়মিত অনুদান ও বেতন ভাতা পায়। সুতরাং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে সেগুলোকেও দুর্নীতি দমন কমিশনের তত্ত্বাবধানে আনতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইতোমধ্যে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। তারা চান, শিক্ষা খাতের প্রতিটি স্তরেই যেন স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হয়—তা সরকারি হোক বা বেসরকারি।”
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “তবে এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না কখন অভিযান শুরু হবে। কারণ বিষয়টি এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যদি এটি বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে শিক্ষা খাতের দুর্নীতি রোধে এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হবে। কিন্তু নির্বাচন শেষ হয়ে গেলে উপদেষ্টা পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন নাও হতে পারে।”
এদিকে মন্ত্রণালয়ের আরেকজন কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে আসা অভিযোগের পরিমাণ বেড়েছে। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনেকেই ইএমআইএস (Education Management Information System) সার্ভারের ত্রুটি বা বিলম্বকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে নানা ধরনের অনিয়ম করছেন। কেউ কেউ শিক্ষক উপস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও বেতন দাবি করছেন, আবার কোথাও অবসরপ্রাপ্ত বা মৃত শিক্ষকের নামে মাসের পর মাস টাকা উত্তোলনের অভিযোগও এসেছে।
সরকার মনে করছে, শিক্ষা খাতের উন্নয়ন ও মর্যাদা রক্ষার জন্য এই অনিয়মগুলোকে আর সহ্য করা যাবে না। তাই এবার সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজেও দুদকের অভিযান চালানোর মধ্য দিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হবে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, অভিযান শুরুর আগে প্রতিটি জেলার শিক্ষা অফিস, উপজেলা শিক্ষা অফিস, এবং মাউশি’র আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে অভিযোগ সংগ্রহ করা হবে। এরপর প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেখানে সরেজমিন অভিযান চালানো হবে।
শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে শিক্ষা খাতের সুনাম পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। তারা বলছেন, “দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসনের সবার সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। তবে দুদকের মতো স্বাধীন সংস্থা মাঠে নামলে অন্তত ভয় তৈরি হবে, এবং এতে অনিয়ম কিছুটা হলেও কমবে।”
সব মিলিয়ে, দেশের শিক্ষা খাতে বহুদিন ধরে চলে আসা দুর্নীতি ও অনিয়মের লাগাম টানতে সরকারের এই পরিকল্পনা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচনের আগে সত্যিই কি দুদক মাঠে নামে, নাকি এই উদ্যোগও থেকে যায় কাগজে-কলমেই।
Leave a Reply