টানা আটদিনের শিক্ষক আন্দোলনের ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণে সপ্তাহের শনিবারগুলোতে ক্লাস নেওয়ার বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী জোটের সদস্যসচিব ও শিক্ষানেতা অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী। তিনি বলেন, “আমরা টানা আটদিন মাঠে আন্দোলন করেছি, এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের কার্যক্রমে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। আগামী ২০ নভেম্বর থেকে স্কুল-মাদ্রাসাগুলিতে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে। অথচ হাতে আছে মাত্র চারটি শনিবার। এই চারটি শনিবার ক্লাস নিলে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব।”
বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) দুপুরে নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া এক লাইভ বক্তব্যে অধ্যক্ষ আজিজী এই আহ্বান জানান। লাইভটিতে দেশজুড়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা সংযুক্ত ছিলেন।
তিনি বলেন, “আমাদের আটদিনের আন্দোলনে সাধারণ মানুষ, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা আন্তরিক সমর্থন জানিয়েছেন। জনগণ আমাদের ন্যায্য দাবি সমর্থন করেছেন, মাঠে নামার নৈতিক শক্তি দিয়েছেন। তাই জনগণের সন্তানদের—অর্থাৎ আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ব পালন করাও এখন আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা যতটুকু সম্ভব পুষিয়ে নেওয়া আমাদের কর্তব্য।”
শনিবার ক্লাস খোলা রাখার বিষয়ে যে কিছু শিক্ষক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন—তা নিয়েও পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেন দেলোয়ার আজিজী। তিনি বলেন, “অনেকেই ভাবছেন, একবার শনিবার ক্লাস চালু করলে হয়তো সরকার পরবর্তীতে এটিকে স্থায়ী করে দিতে পারে। কিন্তু এতে কোনো ভয় বা বিভ্রান্তির সুযোগ নেই। কারণ, শনিবার ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্তটি সরকার দেয়নি, বরং এটি আমাদের বিবেকের তাড়নায়, শিক্ষার্থীদের কল্যাণের জন্য নেওয়া একটি স্বতঃসিদ্ধ সিদ্ধান্ত।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা যারা শিক্ষক, তারা শুধু আন্দোলনের মানুষ নই—আমরা জাতি গঠনের কারিগর। তাই শিক্ষার্থীদের ক্ষতি আমাদের নিজের ক্ষতি। শনিবার ক্লাস নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের পেশাগত দায়িত্ব ও নৈতিক অঙ্গীকার।”
সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে তৈরি হওয়া সংশয় দূর করতে আজিজী বলেন, “আমাদের সিদ্ধান্তের পর যদি সরকার শনিবার ক্লাস নিয়ে কোনো প্রশাসনিক নির্দেশ জারি করতে চায়, তাহলে আমরা নিশ্চুপ থাকব না। তখন ছয় লাখ শিক্ষক-কর্মচারী একসঙ্গে মাঠে নামব, প্রয়োজনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘেরাও করব। কারণ, এখন শিক্ষকদের মধ্যে যে ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে, সেটি আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। এই ঐক্য ভাঙার সাহস কোনো পক্ষেরই নেই।”
তিনি আরও বলেন, “এই ঐক্য ধরে রাখতে হবে। আমরা যদি একসঙ্গে থাকি, তবে শুধু বাড়িভাতা নয়—আমাদের চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা, এমনকি এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের মতো দীর্ঘদিনের দাবিও বাস্তবায়িত হবে।”
উল্লেখ্য, গত ১২ অক্টোবর থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের ন্যায্য তিন দফা দাবিতে টানা কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন। দাবিগুলো হলো—
১️⃣ বাড়িভাড়া ভাতা ২০ শতাংশে উন্নীত করা,
২️⃣ কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ৭৫ শতাংশে উন্নীত করা, এবং
৩️⃣ চিকিৎসা ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকায় উন্নীত করা।
দীর্ঘদিনের এই দাবিগুলোর প্রেক্ষিতে শিক্ষক-কর্মচারীরা রাজধানীসহ দেশব্যাপী অবস্থান, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন। আন্দোলনের অষ্টম দিনে অর্থ মন্ত্রণালয় বাড়িভাড়া ভাতা আংশিক বৃদ্ধির বিষয়ে সম্মতি জানিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২১ অক্টোবর শিক্ষক নেতারা আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন।
তবে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি পূরণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে শনিবার ক্লাস নেওয়ার যে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে, সেটিকে শিক্ষাঙ্গনের অনেকেই প্রশংসা করছেন। শিক্ষক নেতাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা ও পেশাগত সততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী লাইভে শেষে বলেন, “আমরা যে ঐক্য তৈরি করেছি, সেটি এখন শুধু দাবিদাওয়ার সীমায় রাখব না—বরং শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণেও কাজে লাগাব। আমাদের আন্দোলন ছিল ন্যায্য, আর আমাদের দায়িত্ববোধও তেমনই ন্যায্য।”
Leave a Reply