সরকারি চাকরিজীবী, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য নতুন বেতন-ভাতা ও আর্থিক সুবিধা নির্ধারণের লক্ষ্যে গঠিত সচিব কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আজ বুধবার (১৫ জুলাই) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা নতুন জাতীয় পে-স্কেলের বিষয়ে এ বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামোর সম্ভাব্য রূপরেখা, এর আর্থিক প্রভাব, বাস্তবায়নের সময়সূচি এবং ধাপে ধাপে কার্যকর করার কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন পে স্কেল প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। প্রথমত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলা মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বিদ্যমান বেতনবৈষম্য কমিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বেতনকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তৃতীয়ত, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও বাজেট ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে এমন একটি কাঠামো নির্ধারণের চেষ্টা চলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে।
অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। একই বেতন কাঠামো বহাল থাকায় অনেক কর্মচারী জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ বাস্তবতায় নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধু মূল বেতন বৃদ্ধি নয়, পুরো বেতনকাঠামোকে আধুনিক, বাস্তবসম্মত এবং কর্মদক্ষতাবান্ধব করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এমনভাবে পুনর্নির্ধারণের চিন্তা করা হচ্ছে যাতে বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। একই সঙ্গে পদোন্নতির সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির সম্পর্ক আরও কার্যকর করা, ইনক্রিমেন্ট কাঠামো পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও আর্থিক সুবিধা পুনর্বিবেচনার বিষয়টিও আলোচনার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, বিশেষ দায়িত্ব ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধাগুলোও নতুন করে মূল্যায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অপরিবর্তিত থাকা কয়েকটি ভাতা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে সংশ্লিষ্ট মহলে মত রয়েছে। ফলে এসব ভাতা যৌক্তিকভাবে পুনর্নির্ধারণের বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ সফররত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদলও সরকারের নতুন পে স্কেল পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আইএমএফ প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন, সরকার নতুন বেতনকাঠামো একবারে বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। এর উদ্দেশ্য হলো এককালীন বড় অঙ্কের ব্যয় বৃদ্ধি এড়িয়ে বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো এবং সরকারি অর্থব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
আলোচনার সময় আইএমএফ প্রতিনিধিদল জানতে চেয়েছে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারের মোট ব্যয় কতটা বৃদ্ধি পেতে পারে, অতিরিক্ত ব্যয়ের জন্য কী পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হবে এবং সেই অর্থের সংস্থান কীভাবে করা হবে। পাশাপাশি তারা রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কেও বিস্তারিত জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে আইএমএফ বাংলাদেশকে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ শক্তিশালী করা এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, পর্যাপ্ত ও স্থায়ী রাজস্বভিত্তি গড়ে না তুলে বড় আকারের পুনরাবৃত্তিমূলক ব্যয় বৃদ্ধি করলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তবে একই সঙ্গে আইএমএফ ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়নের পক্ষে মত দিয়েছে। সংস্থাটি মনে করে, প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতাও বজায় থাকবে।
এদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছে। আজকের সচিব কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত বা পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা। যদিও বৈঠকের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
Leave a Reply