সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের অভ্যন্তরে আলোচনা চলমান থাকলেও এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারের রাজস্ব আহরণ এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতির চাপও উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় পরিসরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করা হলে সরকারের ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে, যা সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
আইএমএফের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারের বেতন-ভাতা খাতে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে। এর প্রভাব শুধু সরকারি ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; অর্থনীতিতেও এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়বে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ চলে এলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং ভোগব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় এই অতিরিক্ত চাহিদা বাজারে পণ্য ও সেবার দামের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।
আইএমএফের মতে, অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজস্ব আয় কম থাকা, বাজেট ঘাটতি অব্যাহত থাকা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কমে না আসার কারণে এখনই নতুন পে স্কেল কার্যকর করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সংস্থাটি মনে করে, বড় আকারের বেতন বৃদ্ধি সরকারের আর্থিক দায় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ বরাদ্দের ওপরও চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে আইএমএফ আরও উল্লেখ করেছে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী হওয়ার আগে এবং রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তাদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল করার দিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। এরপর আর্থিক অবস্থা আরও অনুকূলে এলে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা অধিক যৌক্তিক হবে।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাজারে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহিত হলে জনগণের সামগ্রিক ভোগব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। অর্থনীতির ভাষায় এটি সামষ্টিক চাহিদা (Aggregate Demand) বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু একই সময়ে যদি পণ্য ও সেবার সরবরাহ সেই হারে বৃদ্ধি না পায়, তাহলে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে বাজারে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে এবং এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সাধারণ মানুষের ওপর।
এ কারণে আইএমএফের পরামর্শ হলো, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসা, রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত পর্যায়ে উন্নীত হওয়া এবং মূল্যস্ফীতি আরও নিয়ন্ত্রণে আসার আগে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন কিছু সময়ের জন্য স্থগিত বা পিছিয়ে দেওয়া হলে তা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ সিদ্ধান্ত হতে পারে।
Leave a Reply