অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে বাংলাদেশ নতুন অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে যুক্ত হতে আগ্রহী হলেও সেই কর্মসূচি অবশ্যই দেশের জনগণের স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রণয়ন করা হবে। জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী বা দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে—এমন কোনো শর্ত সরকার মেনে নেবে না বলেও তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন।
রোববার (১২ জুলাই) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে অর্থমন্ত্রী দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতা, আইএমএফের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন কর্মসূচি এবং সরকারের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, সরকারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশের জনগণের কল্যাণ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে অর্থ সহায়তা গ্রহণের চেয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই আইএমএফের সঙ্গে যেকোনো নতুন কর্মসূচি এমনভাবে তৈরি করা হবে, যাতে বাংলাদেশের জনগণের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি না হয় এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকে।
অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে আইএমএফের সঙ্গে যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল, সেটি জনস্বার্থের অনুকূল ছিল না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কর্মসূচিতে এমন বেশ কিছু শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা একটি গণতান্ত্রিক ও জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তিনি বলেন, আগের কর্মসূচিতে এমন অনেক শর্ত ছিল, যা বাস্তবায়ন করলে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হতো এবং সরকারের নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতাও সীমিত হয়ে যেত। এ কারণেই বর্তমান সরকার সেই কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং নতুনভাবে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য কেবল বৈদেশিক ঋণ বা অর্থ সংগ্রহ নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করা এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা। তিনি বলেন, “আমাদের মূল চিন্তা টাকা পাওয়া নয়। আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ এবং দেশের অর্থনীতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করাই আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।”
তিনি জানান, বর্তমানে যে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে, সেটি এমনভাবে প্রণয়ন করা হবে যাতে অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি জনগণের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। সরকার এমন কোনো শর্তে সম্মত হবে না, যা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “যে কর্মসূচিতেই আমরা অংশ নিই না কেন, সেখানে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ শতভাগ সংরক্ষিত থাকবে। দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান বিবেচনায় রেখেই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
এ সময় তিনি আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব বাংলাদেশ গঠার লক্ষ্যেও সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে সংযুক্ত হতে হলে দেশের বিদ্যমান ভিসা নীতিতে সময়োপযোগী পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান ভিসা নীতি পর্যালোচনা করে সেটিকে আরও সহজ, আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁর মতে, সহজ ও আধুনিক ভিসা ব্যবস্থা চালু হলে বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে আসা আরও সহজ হবে এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে।
তিনি বলেন, ভিসা নীতির আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা আরও সহজে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন এবং বৈশ্বিক ব্যবসায়িক পরিবেশে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হবে।
অর্থমন্ত্রীর মতে, একটি আধুনিক, উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের নীতিগত সংস্কারও প্রয়োজন। সরকার সেই লক্ষ্যেই ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
Leave a Reply