নিজস্ব প্রতিবেদক: নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আগামী ১২ থেকে ১৬ জুলাই ঢাকা সফর করবে সংস্থাটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হবে সরকারের ঘোষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা এবং এর অর্থায়নের কৌশল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল সফরের প্রথম দিনই অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে বসবে। এসব বৈঠকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বাজেট ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আহরণ, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি ব্যয় পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
জানা গেছে, প্রথম বৈঠকে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, রাজস্ব নীতি, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা এবং সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করা হবে। পরবর্তী বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ঘোষিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের বাস্তবায়ন, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এবং এ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করার পরিকল্পনা বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নবম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর করার ঘোষণা দেন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জুলাই মাস থেকেই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের সামনে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হবে বলে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন।
অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় সরকার মধ্যমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা, রাজস্ব আয় বাড়ানোর কৌশল, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যয় এবং নতুন পে-স্কেলের অর্থায়নের রূপরেখা উপস্থাপন করবে। একই সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জনের লক্ষ্যও সরকারের রয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে নবম পে-স্কেলের প্রাথমিক বাস্তবায়নের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে। বাজেটে এ ব্যয়ের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হলে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে। সে কারণে সরকার ধাপে ধাপে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের গতি প্রত্যাশার তুলনায় কম। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ, ব্যাংকিং খাতের নানা দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতির কারণে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই আইএমএফ জানতে চাইছে, অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় সরকারের বাস্তবসম্মত অর্থায়ন পরিকল্পনা কী।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে কম রাজস্ব আহরণ। জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার এখনও সন্তোষজনক নয়। এমন পরিস্থিতিতে বড় অঙ্কের নতুন ব্যয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে দীর্ঘমেয়াদি অর্থের উৎস নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সরকার ইতোমধ্যে আইএমএফের কাছে নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঋণের সম্ভাব্য শর্ত, প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার এবং অর্থায়নের কাঠামো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে। ঢাকা সফরে এসব বিষয় আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে আইএমএফ প্রতিনিধি দল।
অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার যে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের নতুন ঋণ সহায়তা চেয়েছে, সেটি কেবল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার জন্য নয়। এর সঙ্গে কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, জ্বালানি খাতের কাঠামোগত পরিবর্তন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কর্মসূচিও জড়িত। ফলে আসন্ন বৈঠকগুলো শুধু ঋণ আলোচনা নয়, দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রয়োজনে এটিকে আরও সংবাদপত্র-উপযোগী, SEO-অপ্টিমাইজড বা ১০০% ইউনিক প্রকাশযোগ্য সংস্করণেও রূপান্তর করে দিতে পারি।
Leave a Reply