প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় আপাতত কোনো নতুন শিক্ষাক্রম (কারিকুলাম) চালু করা হচ্ছে না। সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্ন সময়ে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর বিষয়ে আভাস দেওয়া হলেও, শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান কারিকুলামের আলোকে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন শিক্ষাক্রম না এলেও বর্তমান কারিকুলামে বড় ধরনের পরিমার্জন, সংশোধন ও সংস্কার আনা হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী, বাস্তবমুখী ও শিক্ষার্থীবান্ধব করতে ইতোমধ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের আধুনিক, আদর্শ, মানবিক ও দক্ষ জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমান পাঠ্যবইগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হবে। এই পরিবর্তনের আওতায় সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় নতুন বিষয়বস্তু সংযোজন করা হবে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় বা পুনরাবৃত্তিমূলক বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো শিক্ষাকে আরও সহজ, আনন্দদায়ক, কার্যকর এবং বাস্তবজীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা।
পরিমার্জিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন দুটি বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে। তারা ‘ক্রীড়া’ এবং ‘সংস্কৃতি’ নামে পৃথক দুটি বই পাবে। অন্যদিকে মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে ‘কারিগরি শিক্ষা’ এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা ‘আনন্দময় শিক্ষা’ নামে দুটি নতুন বিষয়। শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধি, সৃজনশীলতা বিকাশ এবং পড়াশোনাকে আরও আনন্দদায়ক ও বাস্তবমুখী করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শিক্ষার্থীদের জন্য যেকোনো একটি ‘তৃতীয় ভাষা’ শেখার সুযোগও রাখা হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতেই সরকার এ উদ্যোগ গ্রহণ করছে। ভাষাগত দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই এই পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য।
জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষেও শিক্ষার্থীরা ২০১২ সালের পুরোনো কারিকুলাম অনুযায়ী পাঠ্যবই পাবে। অর্থাৎ আগামী শিক্ষাবর্ষে নতুন কোনো শিক্ষাক্রম চালু হচ্ছে না। তবে ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে বড় পরিসরে পরিমার্জিত ও আধুনিকায়ন করা নতুন পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) বর্তমানে বই পরিমার্জনের কাজ পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান কারিকুলাম পরিমার্জনের লক্ষ্যে একটি ব্যাপক কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজন, শিক্ষাবিদ, গবেষক, বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের অংশগ্রহণে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। এসব কর্মশালায় পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু, পাঠদানের পদ্ধতি, মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক দক্ষতা উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানিয়েছে, কারিকুলাম পরিমার্জনের ক্ষেত্রে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শন এবং ‘শিক্ষা সংস্কারের ৩১ দফা’কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন করে পুরো শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের পরিবর্তে বিদ্যমান কাঠামোকেই যুগোপযোগী ও কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, একটি সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘ সময়, ব্যাপক গবেষণা, পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া হঠাৎ নতুন শিক্ষাক্রম চালু করলে শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে একটি কারিকুলাম থেকে অন্য কারিকুলামে দ্রুত স্থানান্তরের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখন ঘাটতি বা ‘লার্নিং গ্যাপ’ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে বিদ্যমান কারিকুলামকে আরও কার্যকর করার নীতিই অনুসরণ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেছেন, নতুন কোনো শিক্ষাক্রম চালু করা হচ্ছে না; বরং বর্তমান কারিকুলামকেই বড় পরিসরে পরিমার্জন ও ঢেলে সাজানো হচ্ছে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু সার্টিফিকেটনির্ভর ও একাডেমিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিবর্তে তাদের সামনে পুরো বিশ্বকে উন্মুক্ত করে দেওয়াই সরকারের মূল লক্ষ্য। আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করাই এই সংস্কারের উদ্দেশ্য।
বাজেট প্রসঙ্গে ড. মাহদী আমিন আরও বলেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া অর্থ যেন কোনো উৎসব, আনুষ্ঠানিকতা বা অপ্রয়োজনীয় কাজে অপচয় না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বরং শিক্ষা খাতের অর্থ যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে এমন খাতে বিনিয়োগ করতে হবে, যা শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বাস্তব অবদান রাখবে।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার নতুন জাতীয় শিক্ষা কারিকুলাম বাস্তবায়ন করে। কারিকুলামটি চালুর পর বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হলেও ২০২৪ সাল পর্যন্ত সেই কারিকুলাম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম চলমান ছিল। পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০১২ সালের পুরোনো কারিকুলাম পুনর্বহাল করা হয়। এরপর বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৮ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনার কথা জানালেও, সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন কোনো শিক্ষাক্রম চালু না করে বিদ্যমান কারিকুলামকেই ব্যাপকভাবে সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
Leave a Reply