সরকারি চাকরিজীবীদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির (ইনক্রিমেন্ট) দীর্ঘদিনের প্রচলিত পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। এতদিন সব গ্রেডে প্রায় একই হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার যে ব্যবস্থা চালু ছিল, আসন্ন নবম জাতীয় বেতনকাঠামোতে সেই নীতিতে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় শুধু গ্রেড নয়, বরং একজন কর্মচারীর আয়, জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং চাকরিজীবীদের বাস্তব প্রয়োজনকে বিবেচনায় রেখে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন এই নীতির ফলে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাবেন। কারণ, সরকার মনে করছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ওপর আর্থিক চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় তাদের জন্য বেতন বৃদ্ধি ও বিভিন্ন ভাতার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে নবম জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রস্তাব দ্রুত চূড়ান্ত করে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনার পর অর্থ বিভাগ এখন চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের সব গ্রেডেই গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়। তবে নতুন বেতনকাঠামোর খসড়ায় এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট মূল বেতনের ৫ শতাংশই থাকবে। তবে ৫ম গ্রেডের ক্ষেত্রে তা কমিয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। একইভাবে ৩য় ও ৪র্থ গ্রেডে ইনক্রিমেন্টের হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২য় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। আর ১ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে একটি বিস্তৃত জাতীয় জরিপ। দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, বেতনকাঠামো পর্যালোচনার অংশ হিসেবে পরিচালিত ওই জরিপে মোট ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ সরকারি চাকরিজীবী, ৬১ হাজার ৫০০ সাধারণ নাগরিক এবং ৩ হাজার ৫১৩টি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান অংশগ্রহণ করেন।
জরিপে দেখা যায়, বর্তমান ইনক্রিমেন্ট ব্যবস্থার পক্ষে মত দিয়েছেন মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। অন্যদিকে ৫০ দশমিক ৪৩ শতাংশ মনে করেন, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারণ করা উচিত। আরও ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জীবনযাত্রার ব্যয়কে ভিত্তি করে ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের পক্ষে মত দেন। এছাড়া জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭৯ দশমিক ৫ শতাংশই ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়ানোর পক্ষে মতামত দিয়েছেন।
এ ছাড়া আলাদাভাবে পরিচালিত একটি অনলাইন জরিপেও বর্তমান বেতনকাঠামো নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষের চিত্র উঠে এসেছে। এতে অংশ নেন ৪ হাজার ১৪৩ জন। তাঁদের মধ্যে মাত্র ১ দশমিক ১৮ শতাংশ মনে করেন বর্তমান বেতন দিয়ে প্রয়োজনীয় পারিবারিক ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। বিপরীতে প্রায় ৯৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, বিদ্যমান বেতনে সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। জরিপে ৮৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ মনে করেন, বেতন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অনেকে ১৮তম, ১৯তম ও ২০তম গ্রেড পুনর্গঠন এবং সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের ব্যবধান আরও কমানোর সুপারিশ করেছেন।
গত সোমবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ দ্রুত মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পথে থাকা কারিগরি জটিলতা দ্রুত সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিচার বিভাগ-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কারিগরি বিষয় নিষ্পত্তির জন্য অতিরিক্ত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বিষয় চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়ার পর অর্থমন্ত্রীর সম্মতি নিয়ে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে-২০২৫’-এর তথ্যকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ওই জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে একটি পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। সিটি করপোরেশন এলাকায় বসবাসকারী পরিবারের ক্ষেত্রে এই ব্যয় আরও বেশি, যা গড়ে ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। আর ছয় সদস্যের একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৬৬ হাজার ২৫৩ টাকা। এসব তথ্যই নতুন বেতনকাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ২০ হাজার টাকা করারও সুপারিশ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে পর্যালোচনা করছে সচিব কমিটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সচিব কমিটি প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতনও কমিশনের প্রস্তাবের তুলনায় কিছুটা কম রাখা হতে পারে।
বেতন কমিশন সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৮ রাখার সুপারিশ করেছে। তবে সচিব কমিটি সেটি আরও কমিয়ে ১:৭ দশমিক ৫ করার প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৯ দশমিক ৪ রয়েছে। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে এই ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমানে ২০তম গ্রেডের একজন সরকারি কর্মচারী বেতন ও বিভিন্ন ভাতা মিলিয়ে মাসে প্রায় ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা পান। নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হলে সেই আয় বেড়ে প্রায় ৪১ হাজার ৯০৮ টাকায় উন্নীত হতে পারে। একইভাবে ১৯তম গ্রেড থেকে শুরু করে প্রথম গ্রেড পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতাও বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষ করে যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা, ধোলাই ভাতা এবং ঝুঁকিভাতার ওপর অধিক নির্ভরশীল হওয়ায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ভাতা বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী সব সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর করা হবে না। বেতন কমিশন চিকিৎসা ভাতা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা করার সুপারিশ করলেও সরকার প্রাথমিকভাবে তা ৩ হাজার টাকা করার বিষয়টি বিবেচনা করছে। একইভাবে সন্তানদের মাসিক শিক্ষা ভাতা ২ হাজার টাকার পরিবর্তে ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কমিশনের সুপারিশের তুলনায় কিছু ভাতা কমানো হলেও তা বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে চলতি অর্থবছরেই নতুন মূল বেতন কার্যকর করা হবে। আর বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করা হবে ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে।
এদিকে বেতনকাঠামো পর্যালোচনা-সংক্রান্ত সচিব কমিটি এবং অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। সব প্রক্রিয়া শেষ হলে এ বিষয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বর্তমান রাজস্ব আহরণের বাস্তবতা বিবেচনায় সচিব কমিটি নতুন বেতনকাঠামো দুই ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে।
Leave a Reply