সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নতুন এই বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বিভিন্ন ধরনের ভাতা এবং সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে সচিব কমিটি একাধিক বিষয়ে নতুন মতামত দিয়েছে, যার ভিত্তিতে চূড়ান্ত গেজেট প্রস্তুতের কাজ এগিয়ে চলছে।
যদিও সরকারের ঘোষণায় গত ১ জুলাই থেকে নবম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, তবে এখনো এ-সংক্রান্ত সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, গেজেট প্রকাশের কার্যক্রম আরও কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে গেজেট প্রকাশে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লেগে যেতে পারে। ফলে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার সময়সূচি নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন পে-স্কেলের প্রাথমিক খসড়ায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হচ্ছে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ব্যবস্থা। বর্তমানে সব গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রায় সমান হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকেন। কিন্তু নতুন প্রস্তাবে সেই পদ্ধতি থেকে সরে এসে গ্রেডভেদে ভিন্ন হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ উচ্চ ও নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ইনক্রিমেন্টের হার এক হবে না। এর পাশাপাশি বেতন কাঠামো, বিভিন্ন ভাতা এবং বাস্তবায়নের পদ্ধতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের ক্ষেত্রে দেশের বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এজন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’-এর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে একটি পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। সিটি করপোরেশন এলাকায় একই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। অন্যদিকে ছয় সদস্যের একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় গড়ে ৬৬ হাজার ২৫৩ টাকা। এসব তথ্য বিবেচনায় রেখেই নতুন বেতন কাঠামোর বিভিন্ন স্তর নির্ধারণের কাজ চলছে।
জাতীয় বেতন কমিশন তাদের সুপারিশে প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে ওই সুপারিশ পর্যালোচনা করে সচিব কমিটি প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন গ্রেডের প্রস্তাবিত মূল বেতনও কিছুটা সমন্বয়ের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল বেতনের অনুপাতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। জাতীয় বেতন কমিশন যেখানে ১:৮ অনুপাতের সুপারিশ করেছিল, সেখানে সচিব কমিটি সেটি কমিয়ে ১:৭.৫ করার পক্ষে মত দিয়েছে। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোয় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল বেতনের অনুপাত রয়েছে ১:৯.৪। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে এই ব্যবধান আরও কমে আসবে।
বর্তমানে ২০তম গ্রেডের একজন সরকারি কর্মচারী মূল বেতন ও বিভিন্ন ভাতা মিলিয়ে মাসিক মোট ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা পান। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে তার মোট বেতন-ভাতা বেড়ে প্রায় ৪১ হাজার ৯০৮ টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ফলে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধু মূল বেতন নয়, ১৯তম গ্রেড থেকে শুরু করে প্রথম গ্রেড পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের ভাতাও পুনর্নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সরকার বিশেষভাবে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের সুবিধার বিষয়টি বিবেচনা করছে। কারণ যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা, ধোলাই ভাতা এবং ঝুঁকিভাতার মতো সুবিধার ওপর নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি নির্ভরশীল। এ কারণে এসব গ্রেডে ভাতা বৃদ্ধির হার অপেক্ষাকৃত বেশি রাখার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
তবে নতুন পে-স্কেলের সব সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর করা হবে না। জাতীয় বেতন কমিশন চিকিৎসা ভাতা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা করার সুপারিশ করলেও সরকার সেটি ৩ হাজার টাকা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করছে। একইভাবে সন্তানদের মাসিক শিক্ষা ভাতা কমিশনের প্রস্তাবিত ২ হাজার টাকার পরিবর্তে ১ হাজার ৫০০ টাকা করারও প্রস্তাব রয়েছে।
অর্থ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী কিছু ভাতার পরিমাণ কমানো হলেও বর্তমানের তুলনায় সব ক্ষেত্রেই ভাতা বৃদ্ধি পাবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে চলতি অর্থবছরেই মূল বেতন বৃদ্ধি কার্যকর করা হবে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করা হবে। অর্থাৎ নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন দুই ধাপে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে এককালীন বাস্তবায়নের দাবিও জোরালো হচ্ছে। সোমবার (৬ জুলাই) বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক এক ভিডিও বার্তায় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নবম পে-স্কেলে প্রস্তাবিত সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা মূল বেতন যেন কোনো ধরনের কিস্তি বা ধাপে ধাপে না দিয়ে একবারেই কার্যকর করা হয়।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সরকারি কর্মচারীরা বিশেষ করে নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীরা চরম আর্থিক সংকটে রয়েছেন। অনেকেই সংসারের ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। প্রায় ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে দুটি পে-স্কেল পাওয়ার সুযোগ থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তাই বর্তমান নবম পে-স্কেলে সেই সময়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
আব্দুল মালেক আরও বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন জাতীয় বেতন কমিশনের কাছে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৩৫ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছিল। তবে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণের পর জাতীয় বেতন কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতিসহ বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন সেই সুপারিশকে সম্মান জানিয়েছে এবং বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রায় ২২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের স্বার্থ বিবেচনায় সরকার নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। তাই প্রস্তাবিত মূল বেতন এককালীন কার্যকর করা হলে কর্মচারীরা প্রকৃত অর্থেই উপকৃত হবেন। অন্যদিকে যদি মূল বেতন ধাপে ধাপে বা ভাগ করে দেওয়া হয়, তাহলে নানা ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে এবং এতে সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশিত সুবিধা কমে যাবে।
ভিডিও বার্তার শেষাংশে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ন্যায্য বেতন ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয়ের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাই নতুন নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ২২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিবারের দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অভিযোগ এবং তাদের ন্যায্য মৌলিক অধিকার বিবেচনায় রেখে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে সরকার—এমন প্রত্যাশাই সবার।
Leave a Reply