প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, মর্যাদা এবং জীবনমান উন্নয়নের বিষয়ে জাতীয় সংসদে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, সরকার পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এবং তাদের পেশাগত মর্যাদা উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিলেই যথেষ্ট হবে না। শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না, প্রশিক্ষণের সঙ্গে শিক্ষকদের সম্মানীও বৃদ্ধি করতে হবে। তাহলে তারা ভালো কিছু ডেলিভার করতে পারবেন।”
তিনি আরও বলেন, সরকার এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চায় যেখানে শিক্ষকরা জীবিকার জন্য অন্য কোনো কাজ করতে বাধ্য হবেন না। তারা যেন সম্পূর্ণ সময়, মনোযোগ ও মেধা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও মানবিক বিকাশে ব্যয় করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই সরকার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয়টি একদিনে বাস্তবায়ন সম্ভব না হলেও সরকার ধাপে ধাপে এ বিষয়ে কাজ করবে। শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদের আর্থিক সুবিধাও বৃদ্ধি করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
এর আগে সম্পূরক প্রশ্নে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা হচ্ছে উচ্চশিক্ষার ভিত্তি বা ফিডার ইনস্টিটিউশন। এই দুই স্তরের শিক্ষার মান উন্নয়ন ছাড়া দেশের উচ্চশিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। অথচ বাস্তব চিত্র হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা তুলনামূলকভাবে কম বেতন পেয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি সংসদে বলেন, বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ১৩তম গ্রেডে মাত্র ১১ হাজার টাকা মূল বেতন দিয়ে চাকরি শুরু করেন। অন্যদিকে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকরা ১০ম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা মূল বেতন পান। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাস্তবতায় এই বেতনে একজন শিক্ষকের পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংসারের প্রয়োজন মেটাতে বিদ্যালয়ের পাঠদানের বাইরে অতিরিক্ত চাকরি, ব্যক্তিগত ব্যবসা কিংবা কৃষিকাজে যুক্ত হতে বাধ্য হন। একই ধরনের আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। ফলে তারা শিক্ষা কার্যক্রমে শতভাগ মনোযোগ দিতে পারছেন না, যা শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা গেলে তারা আরও আন্তরিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তিনি জানান, চলমান বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই বরাদ্দ আরও বাড়িয়ে মোট জাতীয় বাজেটের ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে শিক্ষা খাতে মূলত অবকাঠামো নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। নতুন ভবন, শ্রেণিকক্ষ ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হলেও শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, পেশাগত উন্নয়ন এবং আর্থিক কল্যাণের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সেই অবস্থার পরিবর্তন করতে চায়। তাই ভবিষ্যতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সম্মানী বৃদ্ধিকে সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “আমরা চাই শিক্ষকরা যেন অন্য কোনো কাজে যুক্ত না হয়ে তাদের সময় ও মেধা শিক্ষার্থীদের পেছনে ব্যয় করতে পারেন। এজন্য তাদের সম্মান বাড়ানো প্রয়োজন এবং পর্যায়ক্রমে আমরা এই কাজটি করব।”
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক মানও উন্নত হবে এবং শিক্ষার্থীরা আরও মানসম্মত শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে।
Leave a Reply