সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নতুন জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চললেও এবার বাস্তবায়নের পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিদ্যমান পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো দুই ধাপে কার্যকর করার যে চিন্তা ছিল, তা থেকে সরে এসে একবারেই বা এককালীন পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাবনা এখন অনেক বেশি জোরালো হয়েছে। অর্থ বিভাগের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র থেকে এমন তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে সরকারের পরিকল্পনা ছিল নতুন জাতীয় পে-স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থাৎ প্রথম ধাপে মূল বেতনের একটি অংশ কার্যকর করা এবং পরবর্তী ধাপে বাকি অংশসহ অন্যান্য সুবিধা বাস্তবায়নের চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখা গেছে, দুই ধাপে এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করলে প্রশাসনিকভাবে নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু তাই নয়, এতে সরকারি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি একই বেতন কাঠামো দুই ধাপে কার্যকর হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই সরকার এখন এককালীন বাস্তবায়নের দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশেষ করে সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার আইবাস (iBAS++) প্ল্যাটফর্মে দুই ধাপে নতুন বেতন কাঠামো সমন্বয় করা সহজ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। একই সফটওয়্যারে একাধিক ধাপে বেতন পুনর্নির্ধারণ, ইনক্রিমেন্ট, ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা সমন্বয় করতে গেলে প্রযুক্তিগত জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনাকে সহজ রাখা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে অতিরিক্ত চাপ এড়াতে নতুন পে-স্কেল একবারেই কার্যকর করার বিষয়টি এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো নিয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ এবং কমিশনের সুপারিশগুলো পর্যালোচনার লক্ষ্যে আজ সোমবার সচিবালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।
বৈঠকে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের দেওয়া সুপারিশগুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। বিশেষ করে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে সরকারের ওপর কী পরিমাণ অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে, বাস্তবায়নের সম্ভাব্য সময়সূচি কী হতে পারে এবং বিভিন্ন ক্যাডার ও বিভিন্ন শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বেতন কাঠামোর ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে—এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কমিশনের মূল সুপারিশে যে হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, বাস্তবায়নের সময় সেই হার কিছুটা কমিয়ে আনার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। সরকারের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব আয়, বাজেটের চাপ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক বিষয় বিবেচনায় নিয়েই বেতন বৃদ্ধির হার চূড়ান্ত করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যদিও আজকের বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তারপরও এই বৈঠকেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতন ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার লক্ষ্যমাত্রা ধরে পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সেই সঙ্গে বাস্তবায়নের সম্ভাব্য সময়সূচি, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের বিষয়েও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
অন্যদিকে নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় বিভিন্ন ধরনের ভাতা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি একবারে বাস্তবায়ন নাও হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। মূল বেতন কার্যকর হওয়ার পর বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ধরনের ভাতা নতুন কাঠামোর আওতায় পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি ২০২৭-২৮ অর্থবছর পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
এদিকে নতুন জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় থাকা লাখো সরকারি চাকরিজীবী এখন সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু ঘোষণা হয়নি, তবুও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী সরকার পুরো প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, আর্থিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব বিষয় নিশ্চিত করেই নতুন জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের পথে এগোতে চায় সরকার।
Leave a Reply