সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নে তিন ধাপের পরিবর্তে দুই ধাপে কার্যকর করার বিষয়ে সরকার নীতিগতভাবে এগোচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে। বুধবার (১ জুলাই) পর্যন্ত তিন ধাপে বাস্তবায়নের আলোচনা থাকলেও সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আপত্তি ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, দুই ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও যদি মূল বেতন বা বেসিককে শতকরা হারে ভাগ করে ধাপে ধাপে কার্যকর করা হয়, তাহলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে বড় ধরনের কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেলের মূল বেতনকে ৫০ শতাংশ, ৬০ শতাংশ বা অন্য কোনো হারে ভাগ করে পৃথক ধাপে ফিক্সেশন (বেতন নির্ধারণ) করতে গেলে শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রমই জটিল হবে না, বরং দেশের সরকারি বেতন ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত ডিজিটাল সফটওয়্যারেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। এতে সময়, শ্রম ও প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে ব্যাপক পরিসরে। এ কারণে তারা মূল বেতন একবারেই শতভাগ কার্যকর করে পরবর্তী ধাপে শুধু অন্যান্য ভাতা বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক এ প্রসঙ্গে বলেন, ২০১৫ সালের পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময়কার পরিস্থিতি এবং বর্তমান ব্যবস্থার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তখন সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ বা পে-ফিক্সেশন পুরোপুরি ম্যানুয়ালি সম্পন্ন হতো। কর্মচারীদের সার্ভিস বুক বা এসআর (সার্ভিস রেকর্ড)-এ হাতে লিখেই বেতনের হিসাব নির্ধারণ করা হতো। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন, পরিবর্তন বা সমন্বয় করা তুলনামূলক সহজ ছিল।
তিনি বলেন, বর্তমানে সেই ব্যবস্থা আর নেই। এখন দেশের প্রায় সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) এবং অনলাইনভিত্তিক ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ (iBAS++) সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয়। ফলে বেতন কাঠামোয় সামান্য পরিবর্তন আনতেও সফটওয়্যারের কোডিং, ডাটাবেজ এবং পুরো সিস্টেমে পরিবর্তন আনতে হয়।
আব্দুল মালেকের ভাষায়, যদি সরকার মূল বেতনকে ভাগ করে প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ কিংবা ৬০ শতাংশ কার্যকর করে, তাহলে আইবাস প্লাস প্লাস সফটওয়্যারে সেই নতুন কাঠামোর জন্য আলাদা কোডিং এবং সিস্টেম সেটআপ তৈরি করতে হবে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ধাপে যখন অবশিষ্ট অংশ কার্যকর করা হবে, তখন আবার একই সফটওয়্যার নতুন করে পরিবর্তন করে শতভাগ বেতন কাঠামোয় রূপান্তর করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি কোনো একটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা নির্দিষ্ট দপ্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের সব সরকারি অফিস, অধিদপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত একই সফটওয়্যারে একযোগে এই পরিবর্তন আনতে হবে। ফলে এটি অত্যন্ত জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং প্রযুক্তিগতভাবে চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ হয়ে দাঁড়াবে।
শুধু সফটওয়্যার পরিবর্তনই নয়, ধাপে ধাপে বেতন বাস্তবায়নের কারণে একই কর্মচারীর বেতন ফিক্সেশনের কাজও দুইবার সম্পন্ন করতে হবে বলে উল্লেখ করেন আব্দুল মালেক। তিনি বলেন, প্রথম ধাপে আংশিক বেতন কার্যকর করার জন্য একবার ফিক্সেশন করতে হবে। পরে অবশিষ্ট অংশ কার্যকর করার সময় আবার নতুন করে একই কর্মচারীর বেতন পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এতে প্রশাসনিক পর্যায়ে অতিরিক্ত কাজের চাপ সৃষ্টি হবে এবং একই কাজ দুইবার করতে গিয়ে সময় ও শ্রমের অপচয় হবে। পাশাপাশি সরকারি দপ্তরগুলোতে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও বিশৃঙ্খলারও আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের অবসর-সংক্রান্ত বিষয়েও ধাপে ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়ন নতুন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করেন তিনি। আব্দুল মালেক বলেন, যেসব সরকারি কর্মচারী পিআরএল (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটি) শেষ করে চূড়ান্তভাবে অবসরে যান, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী চাকরি শেষ হওয়ার পরদিনই তাদের সকল আর্থিক পাওনা এককালীন পরিশোধ করা হয়। অর্থাৎ তাদের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি (ফাইনাল সেটেলমেন্ট) সম্পন্ন করতে হয় একবারেই।
তিনি বলেন, চাকরিতে কর্মরত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সরকার চাইলে প্রথমে আংশিক এবং পরে বাকি অংশ দিতে পারে। কিন্তু যিনি ইতোমধ্যে চাকরি থেকে বিদায় নিচ্ছেন, তাকে কীভাবে ধাপে ধাপে পাওনা দেওয়া হবে— সেটিই বড় প্রশ্ন। অবসরের পর একজন কর্মচারীকে ছয় মাস বা এক বছর অপেক্ষা করিয়ে বাকি অর্থ দেওয়ার সুযোগ বাস্তবে নেই।
তার মতে, বর্তমান ডিজিটাল আইবাস প্লাস প্লাস ব্যবস্থায় অবসরে যাওয়া কর্মচারীদের পাওনা আংশিক রেখে পরবর্তীতে পরিশোধের ব্যবস্থা কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন হবে। এতে হিসাব সংরক্ষণ, পাওনা নির্ধারণ এবং অর্থ পরিশোধ— সব ক্ষেত্রেই জটিলতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগও সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প একটি প্রস্তাবও তুলে ধরেন বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, দেশের আর্থিক পরিস্থিতি বা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সরকার যদি একবারে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে না পারে, তাহলে দুই ধাপে বাস্তবায়নের পথ বেছে নিতে পারে। তবে সেই ক্ষেত্রে মূল বেতনকে ভাগ না করে প্রথম ধাপেই শতভাগ বেসিক বা মূল বেতন ফিক্সেশন সম্পন্ন করা উচিত।
তার মতে, দ্বিতীয় ধাপে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধাগুলো কার্যকর করা যেতে পারে। এতে সরকারের ওপর এককালীন আর্থিক চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে, আবার প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতাও অনেকাংশে এড়ানো যাবে।
আব্দুল মালেক বলেন, মূল বেতন যদি একবারেই শতভাগ কার্যকর করা হয়, তাহলে আইবাস প্লাস প্লাস সফটওয়্যারে বারবার পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হবে না। বেসিককে ভাগ করে নতুন কোডিং তৈরিরও দরকার পড়বে না। একই সঙ্গে পিআরএল শেষ করে অবসরে যাওয়া কর্মচারীরাও তাদের প্রাপ্য অর্থ এককালীন বুঝে নিতে পারবেন এবং কোনো অতিরিক্ত জটিলতা ছাড়াই চাকরি থেকে বিদায় নিতে পারবেন।
Leave a Reply