সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে-স্কেল আজ বুধবার (১ জুলাই) থেকে কার্যকর হচ্ছে। যদিও নতুন বেতন কাঠামোর আনুষ্ঠানিক গেজেট এখনো প্রকাশ হয়নি, তবুও সরকার নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এটি কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দুই ধাপে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া এই নতুন পে-স্কেলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতে পারেন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা। বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে কর্মরতদের জন্য পে-কমিশনের মূল সুপারিশ প্রায় অপরিবর্তিত রাখার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত পে-কমিশনের সুপারিশ পুনর্মূল্যায়নকারী সচিব কমিটি বর্তমানে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে। ওই বৈঠকেই নতুন বেতন কাঠামোর বিভিন্ন দিক চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থ বিভাগের একটি সূত্র জানায়, সচিব কমিটি বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়ে পে-কমিশনের সুপারিশ বহাল রাখার পক্ষেই মত দিয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন বা কাটছাঁটের সম্ভাবনা নেই। বরং কমিশন যে হারে বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল, সেটিই বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিম্ন গ্রেডের চাকরিজীবীদের বেতন-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সে কারণেই নবম পে-স্কেল প্রণয়নে গঠিত কমিশন ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য যে বেতন কাঠামো প্রস্তাব করেছিল, তা প্রায় অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত হতে পারে। তিনি জানান, এই গ্রেডের বেতন বৃদ্ধিতে কোনো ধরনের কাটছাঁটের সম্ভাবনা নেই।
তবে একই কর্মকর্তা জানান, ১ম থেকে ৯ম গ্রেডে কর্মরত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে কিছু সমন্বয় আনা হতে পারে। কমিশনের সুপারিশে যে পরিমাণ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবায়নের সময় সেই হার কিছুটা কমানো হতে পারে বলে আলোচনা চলছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী সপ্তাহে সচিব কমিটির বৈঠকেই বিষয়টি নির্ধারণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে শুরুতে নতুন পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে পে-স্কেলের সুপারিশ পুনর্মূল্যায়নে গঠিত সচিব কমিটি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশাসনিক ও কারিগরি দিক বিবেচনায় এখন দুই ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, প্রথম ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর করা হবে। এই ধাপ বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এরপর দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পুনর্নির্ধারণ করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকে সরকারি হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার আইবিএএসপ্লাস (iBAS++)-এ কোনো ধরনের জটিলতা সৃষ্টি না করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এ কারণে ধাপে ধাপে মূল বেতন কার্যকর করার পরিবর্তে একবারেই শতভাগ মূল বেতন কার্যকর করার পক্ষে মত দিয়েছে অর্থ বিভাগ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকেই নতুন পে-স্কেলের শতভাগ মূল বেতন কার্যকর করা হতে পারে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে, অর্থাৎ ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বিভিন্ন ভাতা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নতুনভাবে নির্ধারণ ও বৃদ্ধি করা হতে পারে। এতে সরকারি হিসাব ব্যবস্থাপনায় চাপ কমবে এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও তুলনামূলক সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ নিয়েও প্রস্তুতি চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সচিব কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার পর তা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়ার পরই নবম জাতীয় পে-স্কেলের আনুষ্ঠানিক গেজেট জারি করবে অর্থ মন্ত্রণালয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা জানান, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে চলতি জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে। তবে কোনো কারণে সেই সময়ের মধ্যে গেজেট জারি সম্ভব না হলে জুলাইয়ের পরবর্তী সপ্তাহে এটি প্রকাশ করা হবে। অর্থাৎ জুলাই মাসের মধ্যেই সরকারি চাকরিজীবীরা নবম জাতীয় পে-স্কেলের আনুষ্ঠানিক গেজেট হাতে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
Leave a Reply