শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যদি যথাযথভাবে পাঠদান নিশ্চিত করা যায় এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, তাহলে কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশেই কমে আসবে। তবে বর্তমানে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে কোচিং সেন্টারে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি জানান, ভবিষ্যতে কোচিং সেন্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হবে।
বুধবার (১ জুলাই) ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার সার্বিক প্রস্তুতি, সুষ্ঠু, সুন্দর ও নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা আয়োজন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলে ধরতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী।
সংবাদ সম্মেলনে কোচিং সেন্টারের বিষয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে কোচিং সেন্টারগুলোর কার্যক্রম কীভাবে সমন্বয় করা যায়, সে বিষয়ে সরকার কাজ করছে। কোচিং সেন্টার সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য কতটা উপকারী বা ক্ষতিকর, তা মূল্যায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এ কারণে কোচিং সেন্টারগুলোর কার্যক্রম একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন গ্রহণের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ব্রিটিশ কাউন্সিলের মতো প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল প্রশ্নও হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে। তবে বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তিনি জানান, প্রশ্নপত্র প্রস্তুত ও সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা সরকারি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বিজি প্রেস তিনি নিজেই পরিদর্শন করেছেন। সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ সার্বিক কার্যক্রম খতিয়ে দেখা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তরপত্র মূল্যায়নের মান নিশ্চিত করতে পরীক্ষকদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। শুধু পরীক্ষকের সংখ্যা বাড়ানোই নয়, তারা যথাযথভাবে খাতা মূল্যায়ন করছেন কি না, সেটিও নিবিড়ভাবে মনিটরিং করা হবে বলে জানান তিনি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আকস্মিক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পরীক্ষা পরিচালনার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষা মন্ত্রী বলেন, দেশের যেসব এলাকায় দুর্যোগজনিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, সেখানে স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এসএসসি পরীক্ষার সময়ও কয়েকটি এলাকায় অনুরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। তখন স্থানীয় প্রশাসন কার্যকরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সফলভাবে পরীক্ষা পরিচালনা করেছিল। এবারও প্রয়োজন হলে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ শিক্ষা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার সার্বিক পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, এ বছর দেশের সব শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থী রয়েছে ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৯২ হাজার ৯০৫ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থী রয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ জন।
পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মোট ছাত্রের সংখ্যা ৬ লাখ ২১ হাজার ৯৬৯ জন এবং ছাত্রীর সংখ্যা ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬১৪ জন। সারা দেশে মোট ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯ হাজার ৪৩৯টি।
এ বছর ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি কেন্দ্রীয় সিসিটিভি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে, যেখান থেকে সারাদেশের কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এ ছাড়া প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে দায়িত্ব পালনের পুরো প্রক্রিয়া রেকর্ড করা সম্ভব হয় এবং প্রয়োজনে তা যাচাই করা যায়।
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ৭৭টি বিষয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। ২১ কার্যদিবসে লিখিত পরীক্ষার সম্পূর্ণ কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, যেসব দিনে কোনো পরীক্ষা থাকবে না, সেসব দিনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হবে।
Leave a Reply