সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো তথা নবম জাতীয় পে-স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে আগামী জুলাই মাস থেকেই নতুন পে-স্কেলের সম্পূর্ণ মূল বেতন কার্যকর হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের কমিটি পে কমিশনের সুপারিশ মূল্যায়ন করে বাস্তবায়নের একটি রোডম্যাপ অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য গঠিত পৃথক তিনটি পে কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর কমিটি তাদের সুপারিশ প্রায় চূড়ান্ত করেছে। এখন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষা। অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নসংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করতে পারে অর্থ মন্ত্রণালয়।
প্রাথমিকভাবে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার তিন বছর এবং দুই বছর মেয়াদি—এমন দুটি বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছিল। তিন বছর মেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ করে বাস্তবায়ন এবং তৃতীয় অর্থবছরে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করার প্রস্তাব ছিল।
কিন্তু অর্থ বিভাগ পরবর্তীতে মত দেয় যে, মূল বেতন দুই ধাপে কার্যকর করা হলে সরকারের ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম (আইবাস)-এ কারিগরি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে তারা একবারেই সম্পূর্ণ মূল বেতন কার্যকর করার সুপারিশ করে। তবে সামগ্রিক পে-স্কেল বাস্তবায়ন হবে দুই ধাপে। অর্থাৎ, প্রথম ধাপে সংশোধিত মূল বেতন কার্যকর করা হবে এবং দ্বিতীয় ধাপে বাড়ানো ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা কার্যকর করা হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে। অনুমোদন মিললে জুলাই মাসের মাঝামাঝি অথবা তার পরের সপ্তাহেই এ বিষয়ে সরকারি গেজেট প্রকাশের আশা করা হচ্ছে।
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বর্তমান ২০টি গ্রেডের মধ্যে উচ্চ ও নিম্ন গ্রেডভেদে বেতন বৃদ্ধির হার ভিন্ন হতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১ থেকে ১০ নম্বর গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন প্রায় ১০০ শতাংশ অথবা তার কিছুটা কম বৃদ্ধি পেতে পারে। অন্যদিকে ১১ থেকে ২০ নম্বর গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে গড়ে প্রায় ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য বিশেষভাবে ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দিলেও সেটি কীভাবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, গত ১১ বছর ধরে সরকারি চাকরিজীবীরা একই বেতন কাঠামোর আওতায় রয়েছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
এদিকে, অতীতের পে-স্কেল সংশোধনের মতো এবারও বাজেট নথিতে বেতন-ভাতা খাতে আলাদাভাবে ব্যয় বৃদ্ধির কোনো হিসাব উল্লেখ করা হয়নি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত বরাদ্দটি নেট পাবলিক সার্ভিস খাতের আওতায় রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এ খাতে ব্যয় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে আগামী অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকায় উন্নীত হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে বরাদ্দকৃত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়ের কাজে ব্যয় করা হবে।
নবম পে কমিশন এবারের সুপারিশে মূল বেতনে ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। সে সময় প্রথম ধাপে সংশোধিত মূল বেতন কার্যকর করা হয় এবং পরবর্তী বছরে সংশোধিত ভাতাগুলো কার্যকর করা হয়েছিল।
বর্তমানে দেশের প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকার বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে এ ব্যয় আরও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
Leave a Reply