বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রায়ই একটি প্রশ্ন সামনে আসে—শিক্ষা কি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে পরিচালিত হবে, নাকি তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক নির্দেশনার ওপর নির্ভরশীল থাকবে? সম্প্রতি ঘোষিত ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সেই প্রশ্নটি আবারও নতুন করে সামনে এসেছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ২৯ জুন সকাল ১০টা ৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। একই সঙ্গে দেশের সব মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। একটি শিশুর হাতে একটি গাছ তুলে দেওয়া মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পরিবেশ সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
কিন্তু এখানেই একটি বাস্তব প্রশ্ন উঠে আসে। ২৯ জুন দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্বনির্ধারিত অর্ধবারিষক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। যা কিনা হঠাৎ করে পরিবর্তন করা হয়েছে এবং পরীক্ষা পেছানোর কোন কারণ সেই সময়ে মাউশির নিকট হতে ব্যাখ্যা করা হয়নি। এখন তা প্রমাণ পাওয়া গেল কেন পরীক্ষার সময়সুচী পরিবর্তন করা হয়েছে। পরীক্ষা একটি শিক্ষার্থীর মূল্যায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এবং সেই পরীক্ষা প্রদানে একজন শিক্ষার্থীকে দীর্ঘদিন হতে প্রস্তুতি নিতে হয় বিভিন্ন বিষয়ে। কিন্তু সেই পরীক্ষা যদি এভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে পিছিয়ে দেওয়া হয় তাহলে কি সেই বিষয়ে যথেষ্ঠ প্রশ্নের উদ্বেক হয় না? যে কর্মসূচীর কারণে পরীক্ষার সিডিউল পরিবর্তন করা হলো সেটি যে, একেবারে মুল্যহীন বিষয়টি তেমন নয়, তবে তা নিশ্চয়ই একজন কোমলমতি শিক্ষার্থীর আবেগের চেয়ে মুল্যহীন নয়। একটি পরীক্ষার সাথে শুধু একজন পরীক্ষার্থীর আবেগ জড়িত তা কিন্তু নয় সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানের নানামুখী আয়োজন থাকে যেমন, প্রশ্নপত্র তৈরি, পরীক্ষা পরিচালনা, শিক্ষক-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালন এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি—সবকিছুই একটি নির্দিষ্ট সময়সূচির ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে একই সময়ে জাতীয় কর্মসূচি আয়োজনের নির্দেশনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্বৈত দায়িত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
এটি কেবল একটি দিনের সমস্যা নয়; বরং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের একটি বাস্তব চিত্র। জাতীয় দিবস, বিভিন্ন কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ কিংবা প্রশাসনিক নির্দেশনার কারণে প্রায়ই শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এখন পরীক্ষার কার্যক্রমও ব্যহত হচ্ছে। অনেক সময় শিক্ষকদের পাঠদান বন্ধ রেখে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশের ওপর।
বিশ্বের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে শিক্ষা ক্যালেন্ডারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। একবার পরীক্ষার সূচি বা শিক্ষাবর্ষের পরিকল্পনা নির্ধারণ হয়ে গেলে তা পরিবর্তন করা হয় কেবল বিশেষ ও অনিবার্য পরিস্থিতিতে। কারণ শিক্ষা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এখানে প্রতিটি ক্লাস, প্রতিটি পরীক্ষা এবং প্রতিটি একাডেমিক কার্যক্রমের গুরুত্ব রয়েছে।
আমাদের দেশেও শিক্ষা সংস্কারের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সিঙ্গাপুরের আদলে গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে। সিঙ্গাপুরের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সময়ানুবর্তিতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান। সেখানে শিক্ষার্থীর শেখার সময়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার একাডেমিক প্রভাব বিবেচনা করা হয়।
প্রশ্ন হলো, আমরা যদি সত্যিই সেই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, তাহলে আমাদেরও কি একই ধরনের পরিকল্পিত ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে না?
পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি অবশ্যই প্রয়োজন। গাছ লাগানো একটি মহৎ উদ্যোগ। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের সময় যদি পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি হয়, তাহলে বিকল্প সময় বা ভিন্ন পদ্ধতি বিবেচনা করা আরও কার্যকর হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পরীক্ষা শেষে একই দিন অথবা পরবর্তী কোনো নির্ধারিত দিনে কর্মসূচি পালন করলে শিক্ষার্থীরা আরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে পারত এবং পরীক্ষাও বিঘ্নিত হতো না।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শুধু সরকারি নির্দেশ বাস্তবায়নের কেন্দ্র হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো মূলত জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান। এখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত শিক্ষার্থীর শিক্ষা, শেখার পরিবেশ এবং একাডেমিক শৃঙ্খলা।
একটি উন্নত রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে ওঠে শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। সেই শিক্ষা ব্যবস্থা তখনই কার্যকর হয়, যখন এটি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রয়োজনের চেয়ে শিক্ষার্থীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। নীতি পরিবর্তন হতে পারে, সরকার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু শিক্ষা ক্যালেন্ডার, পরীক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা যেন অযথা ব্যাহত না হয়—এটি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আমাদের সবার লক্ষ্য।
পরিশেষে বলা যায়, ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে একটি ভালো উদ্যোগের সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার বাস্তবায়নের সময়, পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের ওপর। যদি শিক্ষা ব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হয়, তাহলে প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে একাডেমিক বাস্তবতা ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একটি গাছ যেমন ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ, তেমনি একটি নিরবচ্ছিন্ন ও পরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থাও একটি জাতির ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
Leave a Reply