বিশ্বকাপের মূল পর্ব শুরু হওয়ার আগেই বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে ব্রাজিল। দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ এবং তারকা ফরোয়ার্ড নেইমার জুনিয়রের চোট নিয়ে অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে। কাফ মাসলের চোটে ভোগা এই ফুটবলার শুধু মরক্কোর বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচই নয়, পুরো গ্রুপ পর্ব থেকেও ছিটকে যেতে পারেন বলে দাবি করেছে ব্রাজিলের প্রভাবশালী গণমাধ্যম। এমন পরিস্থিতিতে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করতে গিয়ে নিজেদের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে ছাড়াই মাঠে নামার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সেলেসাওদের সামনে।
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে শনিবার মরক্কোর মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। ম্যাচটির আগে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে নেইমারের বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন প্রধান কোচ কার্লো আনচেলোত্তি। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে মরক্কোর বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে খেলতে পারবেন না ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ক্যাম্প চলাকালীন সময় থেকেই কাফ মাসলের চোটে ভুগছেন নেইমার এবং বর্তমানে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
চোটের কারণে এখনও দলের মূল অনুশীলনে ফিরতে পারেননি ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সিধারী এই তারকা। তবে তার দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন আনচেলোত্তি। ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে ব্রাজিল কোচ বলেন, “নেইমার যত দ্রুত সম্ভব সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছেন। আমরা আশা করছি আগামী সপ্তাহের মধ্যেই তিনি দলের সঙ্গে অনুশীলনে যোগ দিতে পারবেন।”
চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকলেও নেইমারকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আনচেলোত্তি। প্রয়োজনে তার পরিবর্তে সম্পূর্ণ ফিট কোনো ফুটবলারকে দলে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই বিকল্প পথে হাঁটেননি ইতালিয়ান এই কোচ। কারণ, তার মতে নেইমারের অবদান কেবল মাঠের পারফরম্যান্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; দলের ভেতরে তার অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে আনচেলোত্তি বলেন, “আমরা যখন নেইমারকে দলে ডেকেছিলাম, তখন শুধু তার ফুটবলীয় দক্ষতার কথা বিবেচনা করিনি, যদিও সেই দক্ষতা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। আমরা তার অভিজ্ঞতা, ড্রেসিংরুমে তার উপস্থিতি এবং তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য তিনি যে অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারেন, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছি।”
তবে কোচের আশাবাদী মন্তব্যের মাঝেই নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম ইউওএল এস্পোর্তের একটি প্রতিবেদন। সেখানে দাবি করা হয়েছে, নেইমারের পুরো গ্রুপ পর্বে খেলা নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, বিশ্বকাপের প্রথম কয়েকটি ম্যাচে তাকে আদৌ দেখা যাবে কি না, সেটি এখনও নিশ্চিত নয়।
ব্রাজিল দলের মেডিকেল স্টাফরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নেইমারের কাফ মাসলে ‘গ্রেড টু’ ইনজুরি শনাক্ত করেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, এই ধরনের চোট থেকে পুরোপুরি সেরে উঠতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। সেই হিসাব অনুযায়ী মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে তার না খেলা নিশ্চিত থাকলেও দ্বিতীয় ম্যাচে ফেরার সম্ভাবনা ছিল।
কিন্তু ইউওএল এস্পোর্তের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি ততটা আশাব্যঞ্জক নয়। নেইমার হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিলের দ্বিতীয় ম্যাচটিও মিস করতে পারেন। এমনকি তিনি অনুশীলনে ফিরলেও ম্যাচ খেলার মতো পূর্ণ ফিটনেস ফিরে পেতে আরও কিছুটা সময় প্রয়োজন হতে পারে।
এর অন্যতম কারণ হলো দীর্ঘদিন প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের বাইরে থাকা। গত ১৭ মে’র পর থেকে কোনো অফিসিয়াল ম্যাচ খেলেননি নেইমার। ফলে শুধু চোটমুক্ত হওয়াই যথেষ্ট নয়; আন্তর্জাতিক পর্যায়ের উচ্চমাত্রার প্রতিযোগিতায় নামার মতো শারীরিক সক্ষমতা ও ম্যাচ রিদম ফিরে পাওয়াও তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক চোটের সঙ্গে লড়াই করায় ব্রাজিল টিম ম্যানেজমেন্টও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। চিকিৎসক এবং কোচিং স্টাফরা কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। তাদের আশঙ্কা, তাড়াহুড়ো করে মাঠে ফেরানো হলে পুরোনো চোট আবারও ফিরে আসতে পারে কিংবা নতুন জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত নেইমারকে মাঠে নামানোর ব্যাপারে তারা খুবই সতর্ক।
সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে নেইমারের প্রত্যাবর্তনের নির্দিষ্ট সময় এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে প্রায় তিন বছর পর ব্রাজিলের বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি গায়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন যে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে উঠেছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ব্রাজিল সমর্থকরা এখন অপেক্ষা করছেন, কবে আবার মাঠে নেমে দলের শিরোপা অভিযানে নেতৃত্ব দেবেন তাদের সবচেয়ে বড় তারকা।
Leave a Reply