ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি সাম্প্রতিক সময়ে আদর্শিকভাবে ডানপন্থি রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে কি না—এ প্রশ্ন এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মতাদর্শ থেকে নেতাকর্মীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করা, জামায়াতঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের যোগদান এবং ইসলামপন্থি জোটের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার পর এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এনসিপি শুরুতে নিজেদের মধ্যপন্থি ও গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তব রাজনীতিতে তাদের অবস্থান নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে।
গত কয়েক মাসে বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতপন্থি বিভিন্ন সংগঠন থেকে বহু নেতাকর্মীকে এনসিপিতে যোগ দিতে দেখা গেছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘যোগদান অনুষ্ঠান’ আয়োজন করে নতুন সদস্যদের দলে স্বাগত জানিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাংগঠনিকভাবে দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার লক্ষ্যেই এনসিপি এই কৌশল গ্রহণ করেছে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করছেন যে, ভিন্ন ভিন্ন আদর্শ ও রাজনৈতিক পটভূমির মানুষের সমাবেশ ভবিষ্যতে দলটির আদর্শিক অবস্থানকে অস্পষ্ট করে তুলতে পারে। বিশেষ করে যখন একটি নতুন দল এখনো নিজেদের পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দর্শন ও সাংগঠনিক নীতিমালা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেনি, তখন এই ধরনের মিশ্র রাজনৈতিক চরিত্র দলটির ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি মতবিরোধও তৈরি করতে পারে।
বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে সাবেক শিবির নেতাদের এনসিপিতে যোগদান এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটে দলটির সম্পৃক্ততা। সমালোচকদের একাংশের মতে, এসব ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এনসিপি আদতে মধ্যপন্থি অবস্থানে নেই, বরং ধীরে ধীরে ডানপন্থি বলয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কেউ কেউ এমন মন্তব্যও করেছেন যে, এনসিপি কার্যত জামায়াতের ‘বি-টিমে’ পরিণত হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলে এই অভিযোগ এখন অন্যতম আলোচিত বিষয়।
তবে দলটির আত্মপ্রকাশের সময় ভিন্ন চিত্র দেখা গিয়েছিল। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দল ঘোষণার সময় এনসিপির নেতারা নিজেদের ‘গণতান্ত্রিক ও মধ্যপন্থি’ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। দল গঠনের আগে তৎকালীন নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তারা এমন একটি রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে চান যেখানে বাম-ডান বিভাজনের বাইরে থেকে বাংলাদেশ প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ রাজনীতি করা সম্ভব হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ইসলামফোবিয়া, উগ্র ইসলামপন্থা কিংবা উগ্র হিন্দুত্ববাদ—কোনোটির সঙ্গেই এনসিপির কোনো সম্পর্ক থাকবে না।
সেই সময় আখতার হোসেন আরও বলেছিলেন, দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্য জনগণের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। তার বিশ্বাস ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এনসিপি একটি বড় রাজনৈতিক দলে পরিণত হতে পারবে এবং প্রচলিত দ্বিদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জায়গা করে নিতে সক্ষম হবে।
কিন্তু দল গঠনের এক বছরের বেশি সময় পার হওয়ার পর এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মূল্যায়ন ভিন্ন। তাদের মতে, এনসিপি যে মধ্যপন্থি পরিচয় দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, বাস্তবে সেই অবস্থান থেকে তারা সরে এসেছে এবং জামায়াতের রাজনৈতিক ছায়ার দিকে চলে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন এ বিষয়ে বিবিসি বাংলাকে বলেন, শুরুতে এনসিপিকে নিয়ে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল এখন আর তা অবশিষ্ট নেই। তার মতে, জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে এনসিপিকে আর মধ্যপন্থি দল বলার সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের যে সুস্পষ্ট মেনিফেস্টো থাকার কথা, এনসিপি এতদিনেও তা প্রকাশ করতে পারেনি। ফলে দলটির আদর্শিক অবস্থান নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের দোলাচল তৈরি হয়েছে।
দলটির অভ্যন্তরেও আদর্শিক মতপার্থক্য নিয়ে টানাপোড়েন দেখা গেছে। একপর্যায়ে বাম ঘরানার অনেক নেতা দল ছেড়ে চলে যান। নির্বাচনের আগে জামায়াতসহ ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের প্রশ্নে নারী নেত্রীদের কেউ কেউও দলত্যাগ করেন। আবার অনেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। এসব ঘটনাকে বিশ্লেষকরা দলটির অভ্যন্তরীণ আদর্শিক সংকটের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন।
এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক দল ছেড়ে পরে বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, দল ছাড়ার পেছনে জামায়াত ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তার ভাষায়, এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যেও সাবেক শিবির কিংবা শিবির-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের উপস্থিতি রয়েছে। তার মতে, যখন একটি দলের বিভিন্ন স্তরে এমন মানুষদের সংখ্যা বাড়তে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই দলটি ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
তবে এনসিপির নেতারা শুরু থেকেই জামায়াতঘনিষ্ঠতার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, এনসিপির ডানপন্থি হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তার যুক্তি হলো, বিএনপিও দীর্ঘ প্রায় ২৯ বছর জামায়াতের সঙ্গে জোটে ছিল, কিন্তু বিএনপি জামায়াতে বিলীন হয়নি কিংবা জামায়াতও বিএনপিতে মিশে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে জামায়াত নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আরও বড় হয়েছে। তার মতে, একইভাবে এনসিপির ক্ষেত্রেও জামায়াতের ‘বি-টিম’ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ দুই দলের মধ্যে মৌলিক আদর্শগত পার্থক্য রয়েছে।
সারজিস আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, জামায়াত ধর্মভিত্তিক ও ডানপন্থি রাজনীতি করে, অন্যদিকে এনসিপি মধ্যপন্থার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তিনি উদাহরণ হিসেবে সংসদে জামুকা বিল পাসের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তার দাবি, ওই বিলের পক্ষে এনসিপি স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিল, যদিও জামায়াতের অবস্থান ছিল ভিন্ন। এর মাধ্যমে দুই দলের আদর্শিক পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হওয়ার পর নির্বাচনের আগে সংগঠন গোছানোর জন্য খুব বেশি সময় পায়নি এনসিপি। দলটির নেতারা শুরুতে আশা করেছিলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়ার রাজনৈতিক ইমেজ কাজে লাগিয়ে খুব দ্রুত তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে তারা অল্প সময়ের মধ্যে দেশের ৬৪ জেলায় সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
এর মধ্যেই ২০২৫ সালের আগস্টে গোপালগঞ্জ সফরে গিয়ে এনসিপির শীর্ষ নেতারা হামলার মুখে পড়েন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, পরে সেনাপ্রহরায় তাদের গোপালগঞ্জ ত্যাগ করতে হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং এনসিপির নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এনসিপি শুরুতে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের আগে দলটি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেয়। সেই জোটের ব্যানারে নির্বাচন করে এনসিপি ছয়টি সংসদীয় আসনে জয় লাভ করে। যদিও দলটির সমর্থকরা এটিকে নতুন দলের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন, সমালোচকদের মতে এই সাফল্য মূলত জামায়াতের নির্বাচনী শক্তির কারণেই এসেছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নির্বাচনী জোট ধীরে ধীরে রাজনৈতিক জোটে রূপ নিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে জোটের পক্ষ থেকে যৌথ কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক মহলে এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে যে, এনসিপি কি স্থায়ীভাবে ডানপন্থি রাজনৈতিক বলয়ের অংশ হয়ে যাচ্ছে?
তবে সারজিস আলম মনে করেন, নির্বাচনী জোট দলটির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার মতে, এনসিপি যদি এককভাবে নির্বাচন করত, তাহলে হয়তো কোনো আসনই পেত না। তিনি বলেন, একটি দল গঠনের মাত্র ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে একাধিক আসনে জয়ের আত্মবিশ্বাস তৈরি করা কঠিন। সেই বিবেচনায় ছয়টি সংসদীয় আসন পাওয়া দলের জন্য ইতিবাচক অর্জন।
তিনি আরও বলেন, সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকলে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন সহজ হয়। বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে সংসদে উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার দাবি, বর্তমানে সংসদে এনসিপির প্রতিনিধিরা প্রশংসিত হচ্ছেন এবং আলোচিত পাঁচজন সংসদ সদস্যের তালিকায় অন্তত তিনজন এনসিপির প্রতিনিধি রয়েছেন।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, শক্ত রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার আগেই ক্ষমতার বলয়ের দিকে ঝুঁকে পড়া এনসিপির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। তার মতে, সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, এনসিপির যারা সংসদ সদস্য হয়েছেন তারা মূলত জামায়াতের সমর্থনেই নির্বাচিত হয়েছেন। অর্থাৎ জামায়াতের সমর্থন ছাড়া এনসিপির নিজস্ব ভোটব্যাংক খুব শক্তিশালী নয়।
তিনি আরও বলেন, যদি জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয়কে দুর্বল করে দেবে। একই সঙ্গে আলাদা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
Leave a Reply