প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেছেন, দেশের শিক্ষকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি জানান, বর্তমান শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীও এ বিষয়ে ইতোমধ্যে মত দিয়েছেন এবং তিনিও একই দাবি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এখনো এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন এবং সরকার সমন্বিতভাবে শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেবে।
শুক্রবার পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা, প্রশাসনিক দুর্নীতি, শিক্ষকদের মর্যাদা এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদের সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সমাজ নানা ধরনের বৈষম্য ও অবহেলার শিকার হয়ে আসছে। তাই পর্যায়ক্রমে শিক্ষকদের এমন একটি বেতন কাঠামোর আওতায় আনা হবে, যেখানে তারা আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
শিক্ষা প্রশাসনে বিদ্যমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে নুরুল হক নুর বলেন, কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা যেন কোনো কাজের জন্য ঘুষ বা অবৈধ অর্থ লেনদেনে জড়িত না হন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কোথাও কোনো টাকা দেওয়া যাবে না এবং কেউ টাকা দাবি করলে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি তাকে জানাতে হবে।
তিনি নিজের পারিবারিক অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। বলেন, তার স্ত্রী শিক্ষাসংক্রান্ত একটি সাধারণ ছুটির কাগজের কাজ করতে গিয়ে পিওনের পেছনে ঘুরেছেন এবং কেরানিকেও টাকা দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং দেশের বাস্তব চিত্র। এখন থেকে কোনো শিক্ষক বা সাধারণ মানুষ যেন কাউকে এক পয়সাও ঘুষ না দেন, সে বিষয়ে তিনি সবাইকে সতর্ক করেন।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, কোনো কর্মকর্তা যদি টাকা দাবি করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “যে অফিসার টাকা চায়, তার জায়গা এখানে হবে না। সে চাকরিও করতে পারবে না।”
বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। বলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শুধু পরিবেশের জন্য নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রতিটি স্কুল পরিষ্কার রাখতে হবে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে রং করা বা ছোটখাটো সংস্কারের মতো কাজের জন্য সবসময় সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না। স্কুল কর্তৃপক্ষ নিজেদের উদ্যোগেও এসব কাজ করতে পারে। একইসঙ্গে স্কুলের আশপাশে বখাটেদের উৎপাত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ইউএনওদের মাঝেমধ্যে বিভিন্ন স্কুল পরিদর্শনে যেতে হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিবেশ ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
নুরুল হক নুর বলেন, প্রতি বছর জেলা প্রশাসক সম্মেলনে (ডিসি সম্মেলন) ডিসিরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা ব্যবস্থার নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। এবারের সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে তিনিও উপস্থিত ছিলেন এবং সেখানে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও শিক্ষকদের মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কথা বলেছেন।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অনেক সময় শিক্ষকরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন, যা অত্যন্ত অসম্মানজনক। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের শিক্ষকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশনা দিয়ে বলেন, শিক্ষকদের মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
নিজের ছাত্র আন্দোলনের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তিনি সবসময় বিশ্বাস করেন যে বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন করতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি। আর সেই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছেন শিক্ষকরা। তাই শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা, সম্মান এবং ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না করলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
Leave a Reply