প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মন্ত্রিসভার কলেবর আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে বলে সরকারের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে রদবদল, দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস এবং নতুন মুখ অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও আলোচনা এগিয়ে গেছে। সরকার ও বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মূলত প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনা, জনসেবা আরও কার্যকর করা এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ঈদুল আজহার পর এবং জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শেষ হওয়ার পরপরই মন্ত্রিসভার এই সম্প্রসারণ কার্যকর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে—যেসব মন্ত্রণালয়ে বর্তমানে অতিরিক্ত কাজের চাপ রয়েছে, সেসব দপ্তরে নতুন নেতৃত্ব যুক্ত করা এবং একজন মন্ত্রীর অধীনে একাধিক মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিশ্চিত করা। সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের মতে, একজন মন্ত্রীর হাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর থাকায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ফাইল নিষ্পত্তি ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে সরকার এখন দায়িত্ব বণ্টনে ভারসাম্য আনার দিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। তবে নতুন পরিকল্পনার আওতায় আরও কয়েকজন উপমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসন থেকে একজন সংসদ সদস্যকেও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। দলীয় ও সরকারি বিভিন্ন সূত্রে যেসব নাম আলোচনায় এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান এবং ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলুর মতো জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা। এছাড়া টেকনোক্র্যাট কোটায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন্নবী খান সোহেলের নামও জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন বলেও আলোচনা রয়েছে।
এছাড়া রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হচ্ছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সংসদ উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তিনি সরকারের বাইরে থাকলেও দলের অভ্যন্তরে এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচিত। ফলে তাকে সংসদীয় কার্যক্রমে বড় ভূমিকা দেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে অর্থ, বাণিজ্য, শিক্ষা, পরিবহন, কৃষি ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একই ব্যক্তি বা সীমিতসংখ্যক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কাঁধে থাকায় প্রশাসনিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম, বাজেট বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন এবং মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে তারা ব্যাপক চাপের মুখে পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানো হলে তা শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই হবে না, বরং প্রশাসনিক কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্যও একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।
এর আগে ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ও প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে প্রায় ৬০ জনে উন্নীত করা হয়েছিল। সে অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান সরকারও প্রয়োজনে বড় পরিসরে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের পথে হাঁটতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও দলীয় সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ ক্ষমতাবলে যেকোনো সময় এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
তবে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান এমপি। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে দলীয় ফোরামে এখন পর্যন্ত কোনো আলোচনা হয়নি। এটা দলের চেয়ারম্যান ও সরকার প্রধান তারেক রহমানই ভালো বলতে পারবেন। তিনি কখন কাকে নেবেন, কোথায় দায়িত্ব দেবেন—এটা সম্পূর্ণ তার এখতিয়ার।’
তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা থেমে নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে অনেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর অধীনে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকায় তারা কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছেন। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, নীতিনির্ধারণ, সংসদীয় জবাবদিহি এবং মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ফলে মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ হলে সরকারের কাজের গতি বাড়বে এবং জনগণের প্রত্যাশিত সেবাও দ্রুত নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দলীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানকে নতুন মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দেখা যেতে পারে। অতীতে বিএনপি সরকারের আমলে তিনি একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। একইভাবে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিমা রহমানও পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। তিনি অতীতেও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি।
অন্যদিকে সরকারের বাইরে থাকা বিএনপির আরেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নামও বিভিন্ন আলোচনায় উঠে আসছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবুও দলের অভ্যন্তরে তার অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় তাকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্বে আনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
টেকনোক্র্যাট কোটায় এখনও দুজনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। এ কারণে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি এখনও সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাননি। তবে দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সক্রিয় ভূমিকা ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার কারণে তাকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। একইভাবে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন্নবী খান সোহেলের নামও টেকনোক্র্যাট কোটার সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে।
এছাড়া বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেলকে প্রতিমন্ত্রী করা হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। বগুড়ার এই নেতা প্রধানমন্ত্রী পরিবারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। একইভাবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জমান দুদুর নামও বিভিন্ন মহলে আলোচনায় রয়েছে। তিনিও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাননি।
বর্তমান মন্ত্রিসভার কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে একই সঙ্গে দুই থেকে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। অথচ অতীতে এসব মন্ত্রণালয়ে পৃথক পৃথক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা উপমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করতেন। উদাহরণ হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়; নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়; বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়; শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়; শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়; টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়; সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, এসব গুরুত্বপূর্ণ খাতে আলাদা নেতৃত্ব নিশ্চিত করা গেলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আসবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হবে এবং সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোও আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
Leave a Reply