সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল আগামী জুলাই মাস থেকে বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে—এমন একটি সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রে। এ লক্ষ্যে আসন্ন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রেখে ইতোমধ্যেই বাজেট প্রণয়নের প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।
পে স্কেলটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের একটি প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। এই খসড়া প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর চূড়ান্ত করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন থেকেই আংশিকভাবে নতুন পে স্কেল কার্যকর করা হতে পারে। এর মাধ্যমে ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। তবে আগের মতোই ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত পুনর্নির্ধারণ করে ১:৮ করা হয়েছে, যা পূর্বে ছিল ১:৯.৪। নতুন প্রস্তাবে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এবং সিনিয়র সচিবদের জন্য বিদ্যমান ২০টি গ্রেডের বাইরে আলাদা একটি বেতন কাঠামো নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে আরও জানা যায়, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন হলে প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি কার্যকর করা হতে পারে এবং পরবর্তী অর্থবছরে বাকি অংশ দেওয়া হবে। আর ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বিভিন্ন ভাতা যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। নবম পে স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের জন্য তিনটি পৃথক বেতন কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে একটি পুনর্গঠিত কমিটি কাজ করছে, যারা এই ধাপভিত্তিক বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে।
এই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আগামী পহেলা জুলাই থেকে পে স্কেল কার্যকর হতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় ইঙ্গিত দিয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
উল্লেখ্য, সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন গত ২১ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন জানানো হয়, বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জুডিশিয়াল সার্ভিস এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য পৃথক বেতন কাঠামোর প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সুপারিশ চূড়ান্ত করার জন্য গত মাসে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই কমিটিই তিন ধাপে পে স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, ধাপে ধাপে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে। প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে অন্তত ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, সচিব কমিটির সুপারিশগুলো বর্তমানে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আসন্ন বাজেটে এ খাতে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হতে পারে। প্রথম ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধি করা হবে এবং পরবর্তীতে চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো হবে। তবে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে।
এর আগে নবম পে কমিশন বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল, তবে পরবর্তীতে তা স্থগিত করা হয়। পে কমিশনের প্রস্তাবে ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছিল।
Leave a Reply