ছোট্ট একটি বিছানা। তাতে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ছোট্ট কোলবালিশ, নরম কাঁথা আর শিশুর ছোট্ট জামাকাপড়। পাশে ঘিয়ে রঙের একটি ছোট্ট ফ্রক হাতে নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন শিরীন আক্তার। এই বিছানাটি ছিল তাঁর নয় মাস বয়সী একমাত্র কন্যার। কয়েকদিন আগে হামের লক্ষণ নিয়ে চিরতরে চলে গেছে শিশুটি। গত সোমবার রাজশাহী শহরের বাসায় গিয়ে দেখা যায় এই হৃদয়বিদারক চিত্র।
শিরীন আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “মেয়ের কথা ভুলতে পারি না। মনে হয় ও ফিরে আসবে। তাই সবকিছু ঠিক আগের মতো সাজিয়ে রেখেছি। আমার তো এখনও বিশ্বাস হয় না যে আমার পাখিটা আর নেই। সবসময় ওর চেহারাটা চোখের সামনে ভাসে।”
শিরীন আক্তারের শিশুকন্যা প্রায় সপ্তাহ দুয়েক আগে জ্বরে আক্রান্ত হয়। স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে কয়েকদিন চিকিৎসার পর সামান্য সুস্থ বোধ হলে তাকে বাসায় নিয়ে আসা হয়। কিন্তু হঠাৎ আবার অসুস্থতা বেড়ে যায়। গত ১৯ এপ্রিল তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শেষের দিকে শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হামের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ র্যাশ ওঠে। অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে চিকিৎসকরা আইসিইউতে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। কিন্তু তখন শুরু হয় আরেকটি যুদ্ধ—আইসিইউর সিটের জন্য অপেক্ষা।
শিরীন আক্তার ক্ষোভ ও দুঃখ মিশিয়ে বলেন, “আইসিইউয়ের সিরিয়াল পেলাম ৩২ নম্বর। কতজনের হাত-পা ধরেছি, কত অনুরোধ করেছি—আমার মেয়েটাকে একটু আইসিইউতে দেন। কিন্তু কেউ কথা শোনেনি। সবাই বলেছে, উপায় নেই।”
শেষ পর্যন্ত গত ২৫ এপ্রিল শিশুটি মারা যায়। মৃত্যুর দু’দিন পর হাসপাতাল থেকে ফোন আসে যে, আইসিইউর সিট ফাঁকা হয়েছে। শিরীন আক্তারের কণ্ঠে তীব্র বেদনা: “তখন আমি সিট নিয়ে কী করবো? যখন সত্যিই দরকার ছিল, তখন তো পাইনি।”
রাজশাহীতে ভয়াবহ পরিস্থিতি
শিরীন আক্তারের মতো অবস্থা এখন বাংলাদেশের অনেক মায়ের। দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে শিশু মৃত্যু। সংকটাপন্ন শিশুদের জীবন বাঁচাতে আইসিইউর জন্য হাহাকার চলছে সর্বত্র।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিত ও সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে ২৭৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন হাজারেরও বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু ঢাকা বিভাগে হলেও, অনুপাতে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা রাজশাহী বিভাগে। এখানে শিশু মৃত্যু হয়েছে ৭০টি, যার মধ্যে শুধু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই ৫৩টি। প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন, স্থান সংকুলান না হওয়ায় এক শয্যায় তিন-চারজন শিশুকে রাখতে হচ্ছে।
সাদিয়া জাহান নামে এক মা কান্না চেপে বলেন, “বেডে দেখেন, তিনটা বাচ্চাকে আমরা গাদাগাদি করে রাখছি। জায়গা নেই। আমার বাচ্চার দুটো অক্সিজেনের দরকার, কিন্তু এখন একটা চলছে। আরেকটা পাইনি। ওর ফুসফুসে ইনফেকশন। আমি মা হয়ে কী বলবো, কেমন লাগছে আমার!”
হাসপাতালের বাস্তব চিত্র
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড করা হয়েছে। তবু বেডে গাদাগাদি অবস্থা। জায়গা না পেয়ে অনেকে মেঝেতে শিশুকে নিয়ে বসে আছেন। রোগীদের বড় অংশই রাজশাহী জেলার বাইরের—কুষ্টিয়া, পাবনা, নাটোর, নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা। অনেকেই আইসিইউর অপেক্ষায়, কিন্তু সিরিয়াল অনেক দূরে।
একটি বেডে দেখা গেল, ছয় মাস বয়সী শিশুর হাত-পা মালিশ করছেন মা রেহানা আক্তার। চিকিৎসক আইসিইউ রেফার করেছেন, সিরিয়াল ৩৪ নম্বর। রেহানা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “এখন সব আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়েছি।”
হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, হাসপাতালে মোট আইসিইউ বেড মাত্র ১৮টি, কিন্তু রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। আশেপাশের জেলাগুলোতে আইসিইউ সেবা অপ্রতুল হওয়ায় সবাই এখানে ছুটে আসছেন। তিনি মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে টিকা না নেওয়া এবং অপুষ্টিকে চিহ্নিত করেন।
মৃত্যু আরও বাড়ার আশঙ্কা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসা সেবার ঘাটতির কারণে রোগীরা বড় শহরে আসছেন। ফলে ঢাকাসহ অন্যান্য হাসপাতালেও চাপ বাড়ছে। টিকাদান কর্মসূচি চললেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, “যদি রোগীদের ভালোভাবে ম্যানেজ করা যেত, ঠিকমতো আইসোলেশন করা যেত, তাহলে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই কমানো যেত।”
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন সতর্ক করে বলেন, মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংক্রমণ কমতে পারে, কিন্তু মৃত্যু কমতে আরও এক মাস লাগবে। ইতোমধ্যে যারা সংক্রমিত হয়েছেন, বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা গুরুতর অবস্থায় চলে যাবেন। ফলে সামনের দিনগুলোতে মৃত্যু আরও বাড়তে পারে।
সরকারের অবস্থান
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান বলেন, রোগী বাড়লে সংকট তৈরি হবেই, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সবাইকে আইসিইউ দেওয়া সম্ভব নয়। মূল লক্ষ্য সংক্রমণ কমানো।
সরকার সারাদেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে টার্গেটের ৬১ শতাংশের বেশি টিকা দেওয়া হয়েছে। আগামী ৮ থেকে ১৫ মে’র মধ্যে সংক্রমণ কমতে শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মহামারি ঘোষণা করলে সব বিভাগ আরও দ্রুত ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারত। বাস্তবে আইসিইউ সংকট ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে অসহায় মায়েদের আর্তনাদ ও শিশু মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জকে নতুন করে তুলে ধরেছে।
Leave a Reply