নোয়াখালী সরকারি কলেজে শিক্ষকদের ওপর হামলা, মারধর, লাঞ্ছনা, প্রাণনাশের হুমকি এবং অধ্যক্ষের কার্যালয়ে ভাঙচুরের গুরুতর অভিযোগে কলেজ শাখা ছাত্রদলের তিন নেতাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি সংগঠনটির সভাপতির পদ দুই মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে এবং এক সাবেক নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে।
স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত নেতারা হলেন—সিনিয়র সহ-সভাপতি মুর্শিদুর রহমান রায়হান, সহ-সভাপতি আক্তারুজ্জামান বিশাল এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক তানভীর হোসেন শাওন। দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, বর্তমান সভাপতি রাশেদুল ইসলাম সোহাগের সাংগঠনিক পদ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে সাবেক সভাপতি আকবর হোসেনকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে শোকজ করা হয়েছে।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলমের স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। এ সিদ্ধান্তে অনুমোদন দিয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ওই দিন দুপুরে কলেজের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর জাকির হোসেন তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে দাপ্তরিক কাজের জন্য কলেজে আসেন। এ সময় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর এবিএম ছানা উল্লাহ এবং শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আফসার উদ্দিন জুয়েলসহ কয়েকজন শিক্ষক একত্রে মধ্যাহ্নভোজে বসেন। ঠিক তখনই কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি রাশেদুল ইসলাম সোহাগের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী অতর্কিত হামলা চালায়। তারা অধ্যক্ষের কার্যালয়ে প্রবেশ করে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে এবং শিক্ষকদের খাবার খেতে বাধা দেয়। একইসঙ্গে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়।
হামলার সময় বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুনশাদুর রহমানকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয় এবং ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে নোয়াখালী সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক এবিএম ছানা উল্লাহ বলেন, তার কক্ষে ভাঙচুর চালানো হয়েছে এবং তাকে খাবার খেতেও দেওয়া হয়নি। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষার্থীরা এমন আচরণ করবে তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে শিক্ষকতা ছেড়ে দেবেন, তবুও অন্যায়ের সঙ্গে আপস করবেন না।
এ ঘটনার পর শিক্ষক পরিষদ জরুরি সভা করে কর্মবিরতিসহ চার দফা দাবি ঘোষণা করে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—হামলাকারীদের ছাত্রত্ব বাতিল, কেন্দ্রীয় ও জেলা ছাত্রদল নেতাদের কাছে লিখিত অভিযোগ প্রদান, থানায় মামলা দায়ের এবং বিচার না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন। জানা গেছে, শিক্ষকরা ইতোমধ্যে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন।
অন্যদিকে, একই ঘটনার প্রেক্ষিতে কলেজ ছাত্রদলের পক্ষ থেকে পাল্টা মানববন্ধন কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছিল।
ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে হেনস্তার শিকার অধ্যাপক জাকির হোসেন বলেন, পিআরএল-সংক্রান্ত জরুরি কাগজপত্র সম্পন্ন করতে দেরি হওয়ায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু তারা খাবার শুরু করার আগেই একদল হামলাকারী সেখানে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায় এবং প্লেট-বাটি ছুড়ে ফেলে দেয়। এছাড়া বারান্দায় রাখা ফুলের টবসহ বিভিন্ন সামগ্রী নষ্ট করা হয়।
তিনি আরও জানান, হামলাকারীরা অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে পূর্বের নির্দেশনা অমান্য করার অভিযোগ তোলে। তারা শিক্ষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে গুরুতর ক্ষতির হুমকি দেয়। একপর্যায়ে প্রতিবাদ করতে গেলে এক শিক্ষককে মারধর করা হয় এবং তার জামা ছিঁড়ে ফেলা হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
হামলার পেছনের কারণ হিসেবে অধ্যাপক জাকির হোসেন দাবি করেন, মূলত অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, শিক্ষকদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ দাবি করা হচ্ছিল এবং সেই দাবি পূরণ না করায় এ ধরনের সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার সময় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। বর্তমানে শিক্ষকরা চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে দায়িত্ব পালনে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। যদিও জেলা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে, তবুও শিক্ষকরা তা গ্রহণে অনীহা জানিয়েছেন।
Leave a Reply