তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সারা দেশে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দিন-রাত বিদ্যুৎ না থাকার কারণে শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই ভোগান্তি বাড়ছে। শুধু দৈনন্দিন জীবন নয়, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে শিল্প ও কৃষি উৎপাদনেও। ফলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আর কতদিন এমন থাকবে—এই প্রশ্নই এখন সবার মুখে মুখে ঘুরছে।
যদিও বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়, তবুও বিদ্যুৎ বিভাগ আশাবাদী যে খুব শিগগিরই পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। তাদের ভাষ্যমতে, আগামী ২৬ এপ্রিল থেকে আদানি পাওয়ার থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একইসঙ্গে, চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে অবস্থিত এসএস পাওয়ারের আইপিপি প্ল্যান্ট থেকেও ২৮ এপ্রিলের পর থেকে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা জানিয়েছেন, ২৮ এপ্রিল থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে, যা সামগ্রিক সংকট কিছুটা লাঘব করবে। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে বন্ধ থাকা আরএনপিএন-এর ইউনিটটি পুনরায় চালু করা গেলে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ মোট প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হতে পারে, যা পরিস্থিতি উন্নত করতে সহায়ক হবে।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা যেতে পারে। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট আগে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করতো, বর্তমানে একটি ইউনিটে সমস্যার কারণে তারা অর্ধেক সরবরাহ করছে। একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে বাঁশখালির এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টেও। তবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং আশা করা হচ্ছে দ্রুতই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু হবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এবং এর ফলে জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে। তারা মনে করেন, এই বাস্তবতায় কিছুদিন লোডশেডিং মেনে নিয়েই চলতে হতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেনের মতে, দেশের প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু করে আপাতত লোডশেডিং কমানো সম্ভব। তবে এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে, যা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে এই খাতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, যা পরিস্থিতি অনুযায়ী বেড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ফার্নেস অয়েলনির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকেও ইচ্ছামতো উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়, ফলে সংকট সমাধানে বাস্তবিক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
Leave a Reply