ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-এর মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে চলা ম্যারাথন বৈঠক শেষ হয়েছে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই। আলোচনার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স-এর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে নতুন এক কূটনৈতিক সমীকরণের আভাস পাওয়া গেলেও, মূল দুটি স্পর্শকাতর ইস্যুতে মতবিরোধ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি বলেই বৈঠক কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে থাকে। আলোচনায় সবচেয়ে বড় বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’র নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের ‘পরমাণু অধিকার’ প্রশ্নটি।
ভ্যান্স তার বক্তব্যে পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত দেন, ওয়াশিংটন এখন তেহরানের কাছ থেকে একটি স্থায়ী ও স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি আদায় করতে চায়—যাতে ইরান কখনোই পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে অগ্রসর হবে না। বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ আগে যেখানে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করার ওপর জোর দেওয়া হতো, সেখানে এখন সরাসরি পরমাণু অস্ত্র তৈরির ধারণা থেকেও সরে আসার প্রতিশ্রুতিকেই আলোচনার মূল শর্ত হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি গড়ে তোলার সক্ষমতাকে কার্যকরভাবে দুর্বল করে দিয়েছে বলে মনে করে। তবে বর্তমান লক্ষ্য হচ্ছে তেহরানের কাছ থেকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ইতিবাচক অঙ্গীকার নিশ্চিত করা। ভ্যান্স এ প্রস্তাবকে ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি অনেকটা “গ্রহণ করো, না হলে প্রত্যাখ্যান করো”—এমন এক কঠিন অবস্থান তৈরি করেছে। তবে আলোচনায় প্রকৃতপক্ষে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তা জানতে ইরানি প্রতিনিধিদলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে, যখন ইসলামাবাদে এত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছিল, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিয়ামিতে একটি ইউএফসি ম্যাচ উপভোগ করছিলেন। যদিও ভ্যান্স দাবি করেছেন, তিনি প্রেসিডেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন, তবুও এমন সংকটপূর্ণ সময়ে প্রেসিডেন্টের হোয়াইট হাউসের বাইরে অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক’ দাবির কারণেই আলোচনায় কোনো সমঝোতা অর্জন সম্ভব হয়নি। তেহরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ওয়াশিংটনের অনমনীয় ও কঠোর অবস্থান একটি কার্যকর আলোচনার কাঠামো তৈরি করার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘ আলোচনার সময় বেশ কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য প্রকাশ পায়। এর মধ্যে ‘হরমুজ প্রণালি’র নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের ‘পরমাণু অধিকার’ ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল ইস্যু। পাশাপাশি আরও কিছু অমীমাংসিত বিষয়ে উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের পথ তৈরি হয়নি।
ইরানি সূত্রগুলোর দাবি, তেহরান তার জাতীয় স্বার্থ ও পরমাণু কর্মসূচির অধিকার রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু শর্ত আরোপ করেছে, যা তাদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে একাধিক দফায় নিবিড় ও দীর্ঘ আলোচনার পরও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমনে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি ছাড়াই বহুল আলোচিত এই বৈঠক সমাপ্ত হয়েছে।
Leave a Reply