যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ আদায় না হওয়া পর্যন্ত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে না—এমন কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে ইরান। রোববার (৫ এপ্রিল) দেশটির রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের যোগাযোগ বিষয়ক উপ-প্রধান সাইয়্যেদ মেহদি তাবাতাবেয়ী এক আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় এই বার্তা দেন, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তাবাতাবেয়ী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ একটি নতুন আইনি কাঠামোর আওতায় পরিশোধ করতে হবে। তিনি বলেন, এই কাঠামো ট্রানজিট ফি বা যাতায়াত মাশুলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে, অর্থাৎ হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী দেশ বা পক্ষগুলোর ওপর নির্দিষ্ট হারে অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা আরোপ করা হবে। তার বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে, ইরান শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ নয়, বরং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
একই পোস্টে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির কড়া সমালোচনা করেন। তাবাতাবেয়ীর দাবি, হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার প্রেক্ষাপটে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলার যে হুমকি ট্রাম্প দিয়েছেন, তা মূলত তার চরম হতাশা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তিনি ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘অশ্লীল’ ও ‘অযৌক্তিক’ বলে আখ্যায়িত করে বলেন, এটি কোনো দায়িত্বশীল নেতার ভাষা হতে পারে না এবং পরিস্থিতিকে আরও উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ একটি পোস্ট দিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। সেখানে তিনি ইরানকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংসের মুখোমুখি করার হুমকি দেন এবং তার ব্যবহৃত ভাষা ও শব্দচয়ন অনেকের কাছেই অত্যন্ত বিব্রতকর ও অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। এই পোস্ট ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে বিরোধী ডেমোক্র্যাট শিবিরের নেতারা তীব্র সমালোচনায় মুখর হয়েছেন।
প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স তার অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে ট্রাম্পের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি লিখেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক মাস পর ইস্টার সানডের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিনে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এমন মন্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। স্যান্ডার্স ট্রাম্পকে ‘বিপজ্জনক’ এবং ‘মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন’ ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, তার এসব বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, বরং প্রলাপের মতো শোনায়। তিনি কংগ্রেসকে দ্রুত হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
একই সুরে সমালোচনা করেছেন আরেক ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি। তিনি ট্রাম্পের আচরণকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন ও উন্মাদনার পর্যায়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় মারফি লেখেন, যদি তিনি ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্য হতেন, তবে ইস্টার সানডের পুরো দিনটি তিনি সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে কাটাতেন—বিশেষ করে সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী নিয়ে, যা প্রেসিডেন্টকে অপসারণের আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ট্রাম্প ইতোমধ্যে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী এবং তার বর্তমান অবস্থান ভবিষ্যতে আরও বিপুল প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরানের কঠোর অবস্থান, ট্রাম্পের উস্কানিমূলক বক্তব্য এবং মার্কিন রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার ফলে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল ও অস্থির হয়ে উঠছে, যা বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
Leave a Reply