সরকার গঠনের মাত্র দেড় মাসের মাথায়, অর্থাৎ প্রায় ৪৫ দিনের মধ্যে, বাংলাদেশের নবনির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার একাধিক জটিল ও বহুমাত্রিক সংকটে পড়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার এই প্রাথমিক সময়েই সরকারকে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ, ডলার সংকট, আমদানি জটিলতা, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ ও গ্যাস ঘাটতির কারণে শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতা, জনস্বাস্থ্য সংকট (বিশেষ করে হামের প্রাদুর্ভাব), চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, গুজব ও আস্থাহীনতা, রাজনৈতিক চাপ, বিরোধী দলের আন্দোলনের আশঙ্কা এবং প্রশাসনিক জটিলতার মতো গুরুতর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ফলে নতুন সরকার শুরু থেকেই এক ধরনের চাপে আবদ্ধ অবস্থায় কাজ করছে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সৃষ্ট সামরিক উত্তেজনা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ওপর। তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া ও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর পাশাপাশি দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, যার ফলে বিপুলসংখ্যক শিশুর মৃত্যু ঘটছে—এ দুটি বিষয় বর্তমানে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠিত হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে দীর্ঘ ১৮ মাস দায়িত্ব পালন শেষে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৬ ফেব্রুয়ারি তাদের দায়িত্ব হস্তান্তর করে। সেই হিসেবে ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত ৪৬ দিন অতিবাহিত হলেও শপথের দিন বাদ দিলে কার্যত সরকারের ৪৫ দিন পূর্ণ হয়েছে।
সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অর্থনৈতিক চাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশে ডলারের ঘাটতি দেখা দেয়, ফলে সময়মতো এলসি (LC) খোলা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে, যা রপ্তানি আয় কমিয়ে দিতে পারে এবং বেকারত্ব বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
অন্যদিকে, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব নতুন করে জনস্বাস্থ্য সংকট সৃষ্টি করেছে। হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট, আইসিইউ ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শিশুদের মৃত্যুহার বাড়তে থাকায় সরকারের ওপর নৈতিক ও সামাজিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় টিকাদান কর্মসূচির প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলছে।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও চাপ বাড়ছে। বিরোধী দলগুলো জ্বালানি ও স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনে নামতে পারে, যা সরকারের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রশাসনিকভাবে তেল সংকট ও কালোবাজারি রোধে মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় রাখা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি সংকট বর্তমানে সবচেয়ে দৃশ্যমান সংকট হিসেবে সামনে এসেছে। দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। অনেক স্থানে মধ্যরাত থেকেই ট্রাক ও গাড়ির লাইন পড়ে যাচ্ছে। সরকার জ্বালানি রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে, যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই বরাদ্দ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। খুচরা বাজারে অতিরিক্ত দামে বোতলজাত তেল বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার রাত ৮টার পর দোকানপাট বন্ধ রাখা, এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং চালু করা, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালুর মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। কৃষিক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে, কারণ ডিজেলের অভাবে সেচ পাম্প চালানো যাচ্ছে না, যা বোরো ধান উৎপাদনে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
সরকার ডিজিটাল ‘ফুয়েল পাস’ বা কিউআর কোড সিস্টেম চালুর পরিকল্পনা করছে, যাতে একজন গ্রাহক নির্দিষ্ট সীমার বেশি তেল কিনতে না পারেন। পাশাপাশি কালোবাজারি ও মজুতদারি রোধে প্রশাসনিক অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
তবে সরকার এখনো জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। জনসাধারণের ওপর চাপ কম রাখতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশীয় বাজারে দাম অপরিবর্তিত রাখার নীতি অনুসরণ করছে। বিকল্প হিসেবে সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশ থেকে তেল আমদানির চেষ্টা চলছে এবং রাশিয়া থেকেও সরাসরি আমদানির সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে অন্তত ৩৮ থেকে ৫০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, যা গত বছরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। ঢাকা, রাজশাহীসহ দেশের অধিকাংশ জেলায় এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মার্চ মাসেই সবচেয়ে বেশি শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অত্যধিক বেড়ে গেছে। আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে হামের কারণে সরাসরি মৃত্যু না হলেও নিউমোনিয়া বা অন্যান্য জটিলতায় শিশুরা মারা যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় কিছু মৃত্যুকে ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে একাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে সেখানে শতাধিক শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং আইসিইউ বেড বাড়ানো হয়েছে। অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
সরকার ইতোমধ্যে জরুরি ভিত্তিতে টিকা কেনার জন্য বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে এবং ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করে পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যার নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই—প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। শিশুদের সময়মতো টিকা দেওয়া, আক্রান্ত হলে দ্রুত আলাদা রাখা (আইসোলেশন), এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ একজন আক্রান্ত শিশু থেকে সহজেই ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, নতুন সরকার এমন এক সময় দায়িত্ব নিয়েছে যখন দেশ একযোগে অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও জনস্বাস্থ্য সংকটে জর্জরিত। এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর সিদ্ধান্ত, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং জনগণের আস্থা অর্জন—এই তিনটি বিষয়ই আগামী দিনের পরিস্থিতি নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
Leave a Reply