এবার নতুন এক বিতর্কে জড়ালেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে— একাধিক নারী সংসদ সদস্যকে (এমপি) শারীরিক সম্পর্কের বিনিময়ে মন্ত্রীত্ব দেওয়ার মতো গুরুতর অনৈতিক কর্মকাণ্ডে তিনি জড়িত। এই বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন তারই দলের প্রভাবশালী হিন্দুত্ববাদী নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামী। শুধু তাই নয়, ওই বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (এক্স/টুইটার) সরব হয়ে আরও বিতর্ক উসকে দিয়েছেন হিন্দুত্ববাদী লেখিকা মধুপূর্ণিমা কিশওয়ার।
তবে এতো বড় অভিযোগ সামনে এলেও এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
সম্প্রতি একটি পডকাস্টে আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব জেফ্রি এপস্টেইন-এর প্রসঙ্গ টেনে এনে সুব্রহ্মণ্যম স্বামী বলেন, বিশ্বের অন্য জায়গার মতো ভারতেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা উচিত। এ সময় তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী শারীরিক সম্পর্কের বিনিময়ে একাধিক নারীকে এমপি এবং মন্ত্রী পদে বসিয়েছেন। তার দাবি, এ বিষয়টি নিয়ে গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, ‘আমি অন্তত তিন থেকে চারজন নারীর নাম বলতে পারি, যারা এমপি হয়েছেন— এবং তাদেরকে তার শয্যাসঙ্গিনী হতে হয়েছে। এমনকি একজন মন্ত্রীও হয়েছেন এই সম্পর্কের ভিত্তিতে।’ পডকাস্টের উপস্থাপক তখন রসিকতার সুরে বলেন, ‘শুধু শয্যায় তো যাননি নিশ্চয়!’ জবাবে স্বামী বলেন, ‘আমি তো শিষ্টাচার বজায় রাখছি…’— যা ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য হিসেবেই ধরা হচ্ছে।
এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর এক্স (সাবেক টুইটার)-এ দীর্ঘ পোস্ট দিয়ে আলোচনায় ঝড় তোলেন মধুপূর্ণিমা কিশওয়ার। তিনি স্বামীর বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে একই সুরে আরও বিস্তৃত অভিযোগ তোলেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কিশওয়ার দীর্ঘদিন ধরেই হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের প্রবল সমর্থক এবং একসময় মোদির ঘনিষ্ঠ হিসেবেও বিবেচিত ছিলেন। এমনকি তিনি মোদিকে মহাত্মা গান্ধী-র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। ফলে তার এই আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন রাজনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য তৈরি করেছে।
তার পোস্টে কিশওয়ার দাবি করেন, নরেন্দ্র মোদি কিছু এমপিকে শারীরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে মন্ত্রীত্ব দিয়েছেন— এবং এই বিষয়টি হিন্দুত্ববাদী মহলের অনেকের কাছেই ‘খোলামেলা গোপন’ হিসেবে পরিচিত। তিনি ইঙ্গিতপূর্ণভাবে হরদীপ সিং পুরী এবং এস জয়শঙ্কর-এর নাম উল্লেখ করে বলেন, তাদের মন্ত্রী হওয়ার পেছনেও ‘বিশেষ পরিষেবা’র গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল।
এক পর্যায়ে তিনি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী স্মৃতি ইরানি-র প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তোলেন— কীভাবে তিনি মন্ত্রী হলেন, তা নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত থাকলেও সেগুলো কখনো প্রকাশ্যে আসেনি। কিশওয়ার দাবি করেন, ২০১৪ সালে বিদেশ সফরের সময়ও তিনি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা বিতর্কিত গুঞ্জন শুনেছেন।
সুব্রহ্মণ্যম স্বামীর বক্তব্য শেয়ার করে কিশওয়ার লিখেছেন, ২০১৪ সালের মে মাসে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিনি সচেতনভাবে তার কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন। এমনকি মোদিকে নিজের লেখা বইয়ের একটি কপি সরাসরি না দিয়ে তার ঘনিষ্ঠ আমলা ভরতলালের মাধ্যমে স্বাক্ষরবিহীন কপি পাঠিয়েছিলেন।
তিনি আরও দাবি করেন, মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সংঘ পরিবারের বিভিন্ন মহলে সেইসব নারীদের নাম ফিসফিস করে উচ্চারিত হচ্ছিল, যারা তার ঘনিষ্ঠতার কারণে এমপি ও মন্ত্রী হয়েছেন। এই কারণেই তিনি শুরুতেই সতর্ক হয়ে যান। তিনি বলেন, হরদীপ পুরী ও জয়শঙ্কর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকেই তাদের অতীত সম্পর্ক নিয়েও গুঞ্জন আরও জোরালো হয়।
২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কিশওয়ার বলেন, সেখানে পর্যন্ত মোদির ‘ঘনিষ্ঠ নারী’দের নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত ছিল। একই সঙ্গে দ্বাদশ শ্রেণি পাস স্মৃতি ইরানিকে শিক্ষামন্ত্রী করার সিদ্ধান্তও অন্য গুঞ্জনগুলোকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মানসি সোনি সংক্রান্ত একটি বিতর্ক ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল এবং এ বিষয়ে নথিপত্রও তিনি দেখেছেন বলে দাবি করেন।
কিশওয়ার আরও লেখেন, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময় থেকে শুরু করে বিজেপির প্রচারক হিসেবে কাজ করার সময় পর্যন্ত মোদির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বহু ‘অশোভন ও অস্বস্তিকর’ গল্প তিনি বিভিন্ন সূত্রে শুনেছেন। এসব গল্প তার মনে এতটাই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল যে, তিনি এমন অনুষ্ঠানও এড়িয়ে চলতেন যেখানে মোদির উপস্থিতির সম্ভাবনা থাকত।
তিনি দাবি করেন, এসব শুনে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং ২০১৪ সালে গভীর হতাশায় আক্রান্ত হন, যা তার স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরবর্তীতে সুস্থতার আশায় ২০১৫ সালে কোয়েম্বাটুরের একটি আয়ুর্বেদিক কেন্দ্রে ২১ দিনের জন্য চিকিৎসা নেন।
এক পর্যায়ে তিনি জানান, এ বিষয়গুলো নিয়ে আরএসএসের এক প্রবীণ বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে কথা বললে তিনি বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে উড়িয়ে দেন এবং বলেন— ‘ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এত ভাবার কী আছে?’ এছাড়া বিজেপির আইটি সেলের দায়িত্বে অমিত মালভিয়াকে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাকেও তিনি দলের নৈতিক অবস্থানের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
সবশেষে কিশওয়ার নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে আরও গুরুতর রাজনৈতিক ও আদর্শিক অভিযোগ এনে বলেন, তিনি হিন্দু সমাজকে দমনের চেষ্টা করছেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাবাধীন হয়ে কাজ করছেন। তার ভাষায়, মোদির ব্যক্তিত্বের বিকার এবং রাজনৈতিক আচরণ তাকে এমন এক নেতার চিত্র তুলে ধরেছে, যিনি দেশের জন্য ক্ষতিকর।
তিনি আরও দাবি করেন, নেতাদের যৌন দুর্নীতি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত, কারণ এতে তারা সহজেই ব্ল্যাকমেইলের শিকার হতে পারেন। কিশওয়ারের ভাষায়, মোদি প্রথম দিন থেকেই ব্ল্যাকমেইলের মধ্যে রয়েছেন এবং তিনি শিগগিরই এর প্রমাণ দেবেন বলেও উল্লেখ করেন।
Leave a Reply