মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। কিন্তু প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়, রাসূল (সা.)-এর জন্মভূমি সৌদি আরবে ঈদ উদযাপনের একদিন পর বাংলাদেশে ঈদ পালন করা হয়। বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল রয়েছে। আসলে এই পার্থক্যের পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক কারণ, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি।
প্রথমত, চাঁদ দেখার বিষয়টি পৃথিবীর সব অঞ্চলে একসঙ্গে ঘটে না। নতুন চাঁদ দৃশ্যমান হওয়ার জন্য সূর্য ও চাঁদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট কোণ—প্রায় ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি—অবস্থান করতে হয়। এই কোণ তৈরি হতে সময় লাগে প্রায় ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা। অর্থাৎ চাঁদের জন্ম হওয়ার পরপরই তা দেখা সম্ভব হয় না; দৃশ্যমান হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় অতিক্রম করতে হয়। অন্যদিকে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের সময়ের ব্যবধানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এক দেশ থেকে অন্য দেশের সময় পার্থক্য প্রায় ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে। ফলে কোনো একটি দেশে চাঁদ দৃশ্যমান হলেও একই সময়ে অন্য দেশে তা দেখা নাও যেতে পারে।
ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী রমজান মাসের সমাপ্তি নির্ভর করে নতুন চাঁদ দেখার ওপর। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “তোমরা চাঁদ দেখে রোজা শুরু করবে এবং চাঁদ দেখে রোজা শেষ করবে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। এই হাদিসের ভিত্তিতেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজ নিজ আকাশে চাঁদ দেখার মাধ্যমে রোজা শুরু ও শেষের সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থাৎ চাঁদ দেখাই হলো ঈদের তারিখ নির্ধারণের মূল ভিত্তি।
ভৌগোলিক অবস্থানও এই পার্থক্যের একটি বড় কারণ। সৌদি আরব বাংলাদেশের তুলনায় পশ্চিমে অবস্থিত। পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে পশ্চিমাঞ্চলে সূর্যাস্ত দেরিতে হয় এবং অনেক সময় সেখানে চাঁদ আগে দেখা যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশ পূর্বে অবস্থিত হওয়ায় এখানে সূর্যাস্ত আগে হয় এবং একই সময়ে চাঁদ দৃশ্যমান নাও হতে পারে। ফলে সৌদি আরবে যেদিন চাঁদ দেখা যায়, বাংলাদেশে অনেক সময় তা দেখা সম্ভব হয় না। পরদিন চাঁদ দেখা গেলে তখন বাংলাদেশে ঈদ উদযাপন করা হয়।
বাংলাদেশে ঈদের তারিখ নির্ধারণ করে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি, যা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। এই কমিটি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে চাঁদ দেখার তথ্য সংগ্রহ করে এবং শরিয়াহ অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত দেয়। যদি দেশের কোথাও চাঁদ দেখা যায়, তাহলে পরদিন ঈদ ঘোষণা করা হয়। আর যদি চাঁদ দেখা না যায়, তাহলে রমজান মাস ৩০ দিন পূর্ণ করে পরদিন ঈদ উদযাপন করা হয়।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, সৌদি আরব ইসলামের পবিত্র ভূমি হওয়া সত্ত্বেও কেন বাংলাদেশ তাদের ঘোষণার সঙ্গে মিল রেখে ঈদ পালন করে না। ইসলামী ফিকহের অধিকাংশ আলেমের মতে, প্রত্যেক অঞ্চলের জন্য নিজস্ব চাঁদ দেখার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই সঠিক পদ্ধতি। কারণ এক অঞ্চলে চাঁদ দেখা গেলেও অন্য অঞ্চলে তা দেখা নাও যেতে পারে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে সব সময় যে সৌদি আরবের একদিন পর বাংলাদেশে ঈদ হয়, এমন নয়। অনেক বছরই দেখা যায়, উভয় দেশেই একই দিনে চাঁদ দেখা যায় এবং একই দিনে ঈদ উদযাপন করা হয়। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে আকাশের অবস্থা, চাঁদের অবস্থান এবং দৃশ্যমানতার ওপর।
মূলত মুসলিম উম্মাহ চন্দ্রবর্ষ অনুসরণ করে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে—যেমন রোজা, লাইলাতুল কদর, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এই চন্দ্রদিন পৃথিবীর সর্বত্র একই থাকে, তবে সময় অঞ্চলের (টাইমজোন) পার্থক্যের কারণে তা ভিন্ন দিনে পালিত হচ্ছে বলে মনে হয়। বাস্তবে চন্দ্র হিসাব একই থাকলেও সৌর সময়ের পার্থক্যের কারণেই এই ভিন্নতা দৃশ্যমান হয়।
Leave a Reply