ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক ব্যতিক্রমধর্মী ও অনুপ্রেরণাদায়ক উদ্যোগের সূচনা করেছেন ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের একদল নবীন শিক্ষার্থী। নিজেদের সীমিত সামর্থ্য, কিন্তু অসীম উদ্যম ও স্বপ্নকে পুঁজি করে তারা গড়ে তুলেছেন একটি ভ্রাম্যমান উন্মুক্ত লাইব্রেরি—যা ইতোমধ্যেই ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। জ্ঞানচর্চা, মুক্তচিন্তা এবং ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এই উদ্যোগ কেবল একটি লাইব্রেরি নয়; বরং এটি এক নতুন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা বলেই মনে করছেন অনেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বরাবরই চিন্তা, সৃজনশীলতা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পথচারী ও দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে এই এলাকা। সেই ব্যস্ত ও প্রাণবন্ত পরিবেশকেই জ্ঞান বিনিময়ের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে রূপ দিতে চেয়েছেন একদল প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তাদের চিন্তাভাবনার ফলস্বরূপই জন্ম নিয়েছে এই ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি—যা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে মানুষের হাতে বই তুলে দেবে এবং পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি করবে।
এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্যোক্তা, প্রথম বর্ষের যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ ফয়সাল বলেন, “আমরা চেয়েছি এমন একটি কিছু করতে, যা মানুষের চিন্তাকে নাড়া দেবে। আমাদের প্রত্যাশা—এই লাইব্রেরির মাধ্যমে ক্যাম্পাসে মুক্ত চিন্তার প্রসার ঘটবে এবং মানুষের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়বে।” তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, এই লাইব্রেরির লক্ষ্য শুধুমাত্র বই পড়ার সুযোগ তৈরি করা নয়; বরং এটি মানুষের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করার একটি প্রয়াস।
লাইব্রেরিটির আরেক উদ্যোক্তা, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী তাবিব ওয়াসীত খান জানান, ঈদ পরবর্তী সময়েই যথাযথ নিয়মাবলি অনুসরণ করে এই লাইব্রেরির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। তিনি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে বই সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার একটি কাঠামো দাঁড় করিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য—যেন সবাই সহজে বই নিতে পারে, পড়তে পারে এবং আবার সঠিকভাবে ফেরত দিতে পারে।” তার কথায় ফুটে ওঠে পরিকল্পনার সুসংগঠিত দিক এবং উদ্যোগটির দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা।
এই ভ্রাম্যমান লাইব্রেরির সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিক হলো এর অর্থায়ন পদ্ধতি। কোনো বড় প্রতিষ্ঠান বা করপোরেট সহায়তা ছাড়াই, সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে এটি গড়ে তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। উদ্যোক্তারা জানান, তারা নিজেদের পকেট থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছেন এবং পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সাবেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকেও সহায়তা পেয়েছেন। এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা প্রমাণ করে—ইচ্ছা ও উদ্যোগ থাকলে সীমাবদ্ধতাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
লাইব্রেরিটির নান্দনিক বিন্যাসও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর একপাশে স্থান পেয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর প্রতিকৃতি, যা বিদ্রোহ, সাম্য ও মানবতার চেতনার প্রতীক হিসেবে কাজ করছে। অন্য পাশে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম সাম্য-এর স্মৃতি, যিনি ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকায় এক মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হন। এছাড়াও শহীদ ওসমান হাদীর একটি অনন্য মন্তব্য এখানে স্থান পেয়েছে, যা পুরো লাইব্রেরিটিকে একটি ভাবনামূলক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ দিয়েছে।
যদিও এখনো লাইব্রেরিটির কোনো আনুষ্ঠানিক নাম নির্ধারণ করা হয়নি, তবে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই একটি অর্থবহ ও দর্শনসমৃদ্ধ নাম ঘোষণা করা হবে। তারা এমন একটি নাম দিতে চান, যা এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য, চেতনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে ধারণ করবে।
এই লাইব্রেরি শুধু বই পড়ার একটি স্থান নয়; বরং এটি হয়ে উঠতে পারে সামাজিক সংযোগ, মতবিনিময় এবং সৃজনশীল আলোচনার কেন্দ্র। ক্যাম্পাসে যেসব শিক্ষার্থী বা পথচারী অবসর সময় কাটান, তাদের জন্য এটি হতে পারে একটি ইতিবাচক বিকল্প। মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় ব্যয় না করে, তারা এখানে এসে বই পড়তে পারবেন, নতুন কিছু জানতে পারবেন এবং নিজেদের চিন্তাকে সমৃদ্ধ করতে পারবেন।
শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহল মনে করছেন, এ ধরনের উদ্যোগ বর্তমান প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে যেখানে বই পড়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, সেখানে এমন একটি উদ্যোগ নতুন করে পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি তরুণদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং দলগত কাজের মনোভাব গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
এছাড়া, এই ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি একটি বার্তাও বহন করছে—সামাজিক পরিবর্তন বড় কোনো শক্তি বা অর্থ দিয়ে নয়, বরং ছোট ছোট উদ্যোগ দিয়েই শুরু হয়। কয়েকজন শিক্ষার্থীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা যে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তারই একটি বাস্তব উদাহরণ এটি।
ইতোমধ্যেই এই উদ্যোগটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন মহল থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এমন উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদি প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে এ ধরনের একটি করে উন্মুক্ত লাইব্রেরি গড়ে ওঠে, তবে তা দেশের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সবশেষে বলা যায়, এই ভ্রাম্যমান উন্মুক্ত লাইব্রেরি কেবল একটি প্রকল্প নয়; এটি একটি স্বপ্ন, একটি আন্দোলন এবং একটি প্রতিশ্রুতি—যেখানে জ্ঞান, মানবতা ও মুক্তচিন্তা একসঙ্গে বিকশিত হবে। দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে এগিয়ে আসে, তবে একটি সচেতন, মানবিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা কোনো দূরস্বপ্ন থাকবে না। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অন্যদের অনুপ্রাণিত করবে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এমন সৃজনশীল কাজের পথ প্রশস্ত করবে।
Leave a Reply