এবারের ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করতে চলেছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। বুধবার (১৮ মার্চ) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় সংগঠনটি ঈদযাত্রায় ভাড়া নৈরাজ্য, যাত্রী হয়রানি এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনার সার্বিক চিত্র নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ সমীক্ষা তুলে ধরে। এতে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গত ২০ বছরের রেকর্ডও এবার অতিক্রম করতে পারে।
সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সরকারি ভাড়া নির্ধারণের ঘোষণা কার্যত উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন রুটে বাস ও মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এখন নৈরাজ্যের পর্যায়ে পৌঁছেছে। শুধু দূরপাল্লার পরিবহন নয়, বুধবার থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন নগরের সিটি সার্ভিস বাসেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতা শুরু হয়েছে। নৌপথের বেশিরভাগ রুটেও একই ধরনের অনিয়ম লক্ষ্য করা গেলেও, সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ বরাবরের মতোই অস্বীকার করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, পরিবহন মালিকদের প্রভাবেই গণমাধ্যমে অনেক সময় ভিন্নধর্মী বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে।
সমিতির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এবারের ঈদে রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসে প্রায় ৪০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর যাতায়াত হতে পারে। এর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন নগরের সিটি বাসগুলোতে আরও প্রায় ৬০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর চলাচল হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ১৪ মার্চ থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের চলাচল, অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ, সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক কার্যক্রম, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের ঈদযাত্রা সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ—এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, এবারের ঈদে প্রায় ৮৭ শতাংশ বাস ও মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়—ঢাকা থেকে পাবনা যেখানে নিয়মিত ভাড়া ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা, সেখানে এখন নেওয়া হচ্ছে প্রায় ১২০০ টাকা। একইভাবে ঢাকা থেকে নাটোর রুটে ৫৫০–৫৮০ টাকার ভাড়া বেড়ে হয়েছে ১২০০ টাকা, ঢাকা থেকে রংপুর ৫০০ টাকার ভাড়া দাঁড়িয়েছে ১৫০০ টাকা। ঢাকা থেকে নোয়াখালীতে ৫০০ টাকার ভাড়া বেড়ে ৮০০ টাকা, লক্ষ্মীপুরে ৭০০ টাকা, রামগঞ্জে ৩৫০ টাকার ভাড়া বেড়ে ৮০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এমনকি ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ লোকাল বাসে ২৫০ টাকার ভাড়া ৬০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা-খুলনা, চট্টগ্রাম-লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রাম-ভোলা রুটেও একইভাবে দ্বিগুণ বা তার বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠে এসেছে। এমনকি ট্রাক ও পিকআপেও যাত্রী বহন করে জনপ্রতি ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। ঈদের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, এই ভাড়ার হার ততই বাড়ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া দেখা গেছে, ৫২ আসনের বাসেও ৪০ আসনের ভাড়া ধার্য করে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ নেওয়া হচ্ছে। সিএনজি ও ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া কাঠামো ভিন্ন হলেও বাস্তবে সব ধরনের পরিবহনেই একইভাবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। কিছু নামী পরিবহন কোম্পানি আবার কৌশলে যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকিট না থাকার অজুহাত দেখিয়ে দূরের গন্তব্যের টিকিট কিনতে বাধ্য করছে। যেমন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যাত্রীদের সাতকানিয়া, চকরিয়া বা বান্দরবানের টিকিট নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। একইভাবে উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের বগুড়ার বদলে রংপুর বা নওগাঁ পর্যন্ত টিকিট কাটতে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটছে।
সমিতির পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে, সরকার ভাড়া নির্ধারণের সময় চালক, সহকারী এবং ভাড়া আদায়কারীর বেতন-ভাতা ও ঈদের বোনাস ভাড়ার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করে দিলেও বাস্তবে অধিকাংশ পরিবহন মালিক তা পরিশোধ করেন না। চালক ও সহকারীদের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য নিশ্চিত হয়েছে বলে জানানো হয়। সংগঠনটির মতে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ঈদকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি, পরিবহন পরিচালনায় অতিরিক্ত খরচ, কর্মচারীদের বোনাস এবং মালিকদের বাড়তি মুনাফার লোভ—এসব কারণে পরিবহন খাতে এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলকভাবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো, সড়ক ও নৌপথে ভাড়া মনিটরিংয়ের জন্য গঠিত ভিজিল্যান্স টিমে যাত্রী সংগঠনের কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকায় যাত্রীস্বার্থ রক্ষার কার্যকর কোনো পক্ষ সেখানে নেই। ফলে অনিয়ম বন্ধে বাস্তবিক কোনো জবাবদিহিতা তৈরি হচ্ছে না।
সমিতির হিসাব অনুযায়ী, এবারের ঈদে দূরপাল্লার বাসে যাতায়াতকারী প্রায় ৪০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর মধ্যে ৮৭ শতাংশ যাত্রীকে গড়ে ৩৫০ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। এতে মোট অতিরিক্ত আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অন্যদিকে, সিটি বাসে ৬০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর মধ্যে ৮৭ শতাংশ যাত্রী গড়ে ৫০ টাকা বেশি দিলে অতিরিক্ত আদায় হবে প্রায় ২৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে শুধু বাস ও মিনিবাস খাতেই এবারের ঈদে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকার অতিরিক্ত ভাড়া আদায় হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে—গণপরিবহনে ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে ভাড়া আদায় চালু করা, নগদ লেনদেন বন্ধ করা, সড়ক-মহাসড়কে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। সংগঠনটির মতে, এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে ঈদযাত্রায় ভাড়া নৈরাজ্য অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
Leave a Reply