রাজধানীর মিন্টুরোডে সরকারি বাসভবনে আয়োজিত এক ইফতার পরবর্তী মতবিনিময় সভায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং আসন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী A N M Ehsanul Haque Milon। শনিবার (১৪ মার্চ) শিক্ষা বিটে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে তিনি জানান, বেসরকারি শিক্ষকদের উৎসব ভাতা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে শতভাগ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার এবং আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে উৎসব ভাতা পান। তবে সরকার এ ভাতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, যেখানে উৎসব ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনার জন্য বলা হয়েছে। তিনি জানান, প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। মন্ত্রী কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অভ্যন্তরীণ আলোচনা অনেক সময় আগেভাগেই বাইরে চলে যাচ্ছে, যা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জন্য ভালো নয়।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে উৎসব ভাতা ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করা হতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে এটি বাড়িয়ে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে শতভাগে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো বেসরকারি শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা, যাতে তারা নিশ্চিন্তে শিক্ষাদানে মনোনিবেশ করতে পারেন।
পাবলিক পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হলেও ভবিষ্যতে সারাদেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তার ভাষায়, দেশের সব শিক্ষার্থীর জন্য একই মানদণ্ড থাকা উচিত। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, বিশ্বের অনেক বড় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাই একই প্রশ্নপত্রে অনুষ্ঠিত হয়। তাই বাংলাদেশেও একই পদ্ধতি চালু করা সম্ভব। এ বিষয়ে আগামী বছর থেকেই কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা নিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিন্তাভাবনা চলছে।
আসন্ন এসএসসি ও সমমান পরীক্ষাকে সামনে রেখে নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাকে নিজের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, অতীতের মতো এবারও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা হবে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে যদি কেউ প্রশ্ন ফাঁসের অপচেষ্টা করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, প্রয়োজনে তিনি নিজেও মাঠপর্যায়ে গিয়ে পরীক্ষার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নিজের কাছে একটি ‘ইবাদতখানা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে মন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি আগামী ১৮০ দিনের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেছেন। তার লক্ষ্য হলো এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই এমন কিছু মৌলিক ভিত্তি তৈরি করা, যার প্রভাব দীর্ঘ সময়—এমনকি ১৮০ বছরের সমতুল্য সময় পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে। তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ধীরস্থিরভাবে এগোতে চান, যাতে কোনো ভুল পদক্ষেপ না হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি তিন স্তরের স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ব্যবস্থায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে যাচাই-বাছাই করা হবে। এতে করে যোগ্য ব্যক্তিরাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় আসতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সম্প্রতি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৮ বছরের অভিজ্ঞতার বাধ্যবাধকতা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সে প্রসঙ্গেও ব্যাখ্যা দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, গত ১৫ থেকে ১৭ বছরে রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণে অনেক শিক্ষক বঞ্চিত হয়েছেন। সেই বঞ্চিত শিক্ষকদের জন্য সুযোগ তৈরি করতেই অভিজ্ঞতার বিষয়টি যৌক্তিকভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া তিনি জানান, ২০২৭ সালের জন্য যে নতুন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হচ্ছে, সেটিও তার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী ও আধুনিক করতে পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষাক্রমে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জন করা হবে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাজের গতি নিয়েও কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই কাজের অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে হচ্ছে না। এ কারণে তিনি কর্মকর্তাদের স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, গতানুগতিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ সম্পন্ন করতে হবে। তার মতে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য কাজ করতে আসেননি; বরং দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নই হওয়া উচিত সবার প্রধান লক্ষ্য।
Leave a Reply