বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান পদে নিয়োগের যোগ্যতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বেসরকারি স্কুল-কলেজ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পেতে হলে এখন থেকে কমপক্ষে ১৮ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আগে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞতার শিক্ষকরা এসব পদে আবেদন করতে পারলেও নতুন বিধান কার্যকর হলে অনেক প্রার্থী স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ পড়ে যাবেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা এক পরিপত্রে বলা হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা–২০২৫ এর পরিশিষ্ট-ঘ (ক) এর ১ নম্বর ক্রমিকের ৪ নম্বর কলামে থাকা ‘অভিজ্ঞতা ও চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা’ অংশটি সংশোধন করে নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ এবং ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ বা অধ্যক্ষ পদে আবেদন করতে হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে প্রভাষক, জ্যেষ্ঠ প্রভাষক বা সহকারী অধ্যাপক পদে মোট ১৮ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এই অভিজ্ঞতা ডিগ্রি কলেজ, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ কিংবা স্কুল অ্যান্ড কলেজে অর্জিত হতে হবে।
একইভাবে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আলিম, ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও একই ধরনের শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ বা সমমানের পদে আবেদন করতে হলে এমপিওভুক্ত প্রভাষক (সাধারণ), জ্যেষ্ঠ প্রভাষক অথবা সহকারী অধ্যাপক (সাধারণ) হিসেবে মোট ১৮ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে বলে পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে কর্মরত প্রধান শিক্ষক বা সহকারী প্রধান শিক্ষক যারা কলেজের অধ্যক্ষ পদে আবেদন করতে চান, তাদের ক্ষেত্রেও বিশেষ শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নীতিমালার নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণের পাশাপাশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইনডেক্সধারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে অন্তত ২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে মোট ১৮ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
অন্যদিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইনডেক্সধারী সহকারী প্রধান শিক্ষক বা নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক যদি প্রতিষ্ঠান প্রধান পদে আবেদন করতে চান, তবে তাদেরও নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি ইনডেক্সধারী হিসেবে কমপক্ষে ৩ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং সব মিলিয়ে এমপিওভুক্ত পদে ১৮ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন এই অভিজ্ঞতার শর্ত যুক্ত হওয়ার ফলে ইতোমধ্যে আবেদন করা প্রার্থীদের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যেতে পারেন। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় অর্ধেকের মতো আবেদনকারী এই শর্ত পূরণ করতে পারবেন না। এ কারণে তাদের আবেদন ফি ফেরত দেওয়া হবে কিনা এবং নতুন করে আবেদন গ্রহণ করা হবে কিনা—সেসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আলোচনা করছে।
দেখুন পরিবর্তিত পরিপত্র এখানে
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে দুটি সম্ভাব্য পথ সামনে রাখা হয়েছে। প্রথমটি হলো বর্তমানে যে আবেদনগুলো জমা পড়েছে সেগুলোর ভিত্তিতেই পরীক্ষা আয়োজন করা, যেখানে নতুন শর্ত পূরণ করতে না পারা প্রার্থীদের বাদ দেওয়া হবে। আর দ্বিতীয়টি হলো পুরো প্রক্রিয়াটি নতুন করে শুরু করে আবার আবেদন আহ্বান করা। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে তিনি জানান।
জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান পদে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ১৮ বছর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে ১২ বছর বা ১৫ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত থাকায় তুলনামূলক কম বয়সী শিক্ষকরা বেশি সংখ্যায় আবেদন করেছিলেন। তবে সিনিয়র শিক্ষকদের বাদ দিয়ে জুনিয়রদের এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিলে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—এমন যুক্তি থেকেই অভিজ্ঞতার সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় বেশি দক্ষতা ও স্থিরতা আনতে পারবেন। তবে অনেক তরুণ শিক্ষক মনে করছেন, নতুন এই বিধান তাদের পদোন্নতির সুযোগ অনেকটা সীমিত করে দেবে। ফলে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষা মহলে ইতোমধ্যেই আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
Leave a Reply