একই যোগ্যতা, একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা এবং একই প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে নিয়োগ পেলেও বেতন গ্রেড বৈষম্যের কারণে টানা দুই মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক (কৃষি শিক্ষা) পদে নিয়োগপ্রাপ্তরা। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-এর ৭ম গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গত জানুয়ারিতে নিয়োগ পাওয়া এসব শিক্ষক বর্তমানে চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। সামনে ঈদুল ফিতর ঘনিয়ে এলেও বেতন না পাওয়ায় পরিবার নিয়ে কীভাবে ঈদ উদযাপন করবেন, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৭ম গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সুপারিশপ্রাপ্ত মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক (কৃষি শিক্ষা) পদে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা গত ১ ফেব্রুয়ারি নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং দীর্ঘদিনের প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী সহকারী শিক্ষক (কৃষি) পদটি স্কুল ও মাদ্রাসা উভয় ক্ষেত্রেই ১০ম গ্রেড হিসেবে বিবেচিত ছিল। সেই ধারণা থেকেই শিক্ষকরা এমপিওভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ফাইল পাঠান। কিন্তু ফাইল পাঠানোর পর দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট সেন্ট্রাল প্রোগ্রামার একের পর এক ফাইল বাতিল করে দিচ্ছেন।
এনটিআরসিএর পরীক্ষায় স্কুল ও মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষকদের জন্য একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং একই ধরনের যোগ্যতা ও সনদের ভিত্তিতে তাদের নির্বাচন করা হয়। কিন্তু চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, স্কুলের কৃষি শিক্ষকরা ১০ম গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন, অথচ মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষকদের জন্য ১১তম গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে একই পদে নিয়োগ পাওয়া দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মধ্যে স্পষ্ট বেতন বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
এমপিও ফাইলগুলো বাতিল করার সময় মন্তব্যে বলা হচ্ছে যে, ফাইলগুলো ১১তম গ্রেডে পাঠাতে হবে। এতে শিক্ষকরা বিস্মিত ও হতাশ হয়ে পড়েছেন। কারণ স্কুলের ক্ষেত্রে সহকারী শিক্ষক (কৃষি) পদ এখনও ১০ম গ্রেডে বহাল রয়েছে, কিন্তু মাদ্রাসার ক্ষেত্রে সর্বশেষ এমপিও নীতিমালায় এটি ১১তম গ্রেড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে একই পদ, একই যোগ্যতা এবং একই পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পেলেও বাস্তবে দুই ধরনের গ্রেডের জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এই সমস্যার সমাধান চেয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষকরা কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে স্মারকলিপি দেন। সচিব বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন বলে আশ্বাস দেন এবং এটিকে প্রকৃতপক্ষে একটি বৈষম্য বলেও উল্লেখ করেন। পরে বিষয়টি সমাধানের জন্য একটি ফাইল শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়। শিক্ষামন্ত্রীর দপ্তর থেকে ফাইলটি অনুমোদন করা হলেও এখন পর্যন্ত সংশোধিত নীতিমালা জারি হয়নি।
সংশোধিত নীতিমালা জারি না হওয়ায় সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। ফলে ফেব্রুয়ারি মাসের মতো মার্চ মাসের এমপিওভুক্তির ফাইলগুলোও আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। যদিও সম্প্রতি মাদ্রাসা এমপিও নীতিমালার সংশোধনী হিসেবে প্রভাষক পদের একটি নীতিমালা জারি করা হয়েছে। তবে সহকারী শিক্ষক (কৃষি) পদের গ্রেড সংশোধনের নীতিমালা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। এ নিয়ে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
তবে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের দাবি, মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি প্রয়োজন, কারণ এতে আর্থিক বিষয় জড়িত রয়েছে। এ কারণে দ্রুত সময়ের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সম্মতি মিললে এরপর সংশোধিত নীতিমালা জারি করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডের বিষয়টি সমাধানে কাজ চলছে এবং নিয়ম মেনেই বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ফেব্রুয়ারি মাসের পর মার্চ মাসের এমপিওভুক্তির ফাইলও বাতিল হওয়ায় শিক্ষকরা ইতোমধ্যে দুই মাসের বেতন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। টানা দুই মাস বেতনহীন থাকায় অনেকেই চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। রমজান মাসে বেতন না পাওয়ায় তাদের পারিবারিক জীবনেও চাপ তৈরি হয়েছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষক মো. ওলি বলেন, নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে তারা অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু দুই মাস ধরে বেতন না পাওয়ায় সেই স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে। সামনে ঈদ হলেও পরিবারের জন্য কিছুই করতে পারছেন না বলে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
আরেক শিক্ষক মো. মাসুদ বলেন, নিয়োগের সময় তারা ১০ম গ্রেড জেনেই চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। একই পরীক্ষা দিয়ে স্কুলের কৃষি শিক্ষকরা ১০ম গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন, কিন্তু মাদ্রাসায় যোগ দেওয়ার পর তারা ১১তম গ্রেডের জটিলতায় পড়েছেন। দ্রুত এই বৈষম্যের সমাধান করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
শিক্ষকরা বলছেন, দ্রুত মাদ্রাসা এমপিও নীতিমালার সংশোধিত নির্দেশনা জারি করে সহকারী শিক্ষক (কৃষি) পদের গ্রেড বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ইতোমধ্যে জমা দেওয়া এমপিও ফাইলগুলো যেন আর বাতিল না করা হয় এবং দ্রুত বেতন পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়—এ দাবিও জানিয়েছেন তারা।
Leave a Reply