পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬-এর জন্য আবদুল মুকিত মজুমদার, যিনি মুকিত মজুমদার বাবু নামেও পরিচিত, তাকে মনোনীত করা হয়েছে। তবে তার এই মনোনয়নকে ঘিরে ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় তার নাম রয়েছে। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে, যা বিষয়টিকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে।
জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ মোট ১৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং ৫টি প্রতিষ্ঠান। গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়।
স্বাধীনতা পুরস্কার বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা হিসেবে বিবেচিত। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ১৯৭৭ সাল থেকে প্রতি বছর সরকার এই পুরস্কার প্রদান করে আসছে। পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ১৮ ক্যারেট মানের ৫০ গ্রাম স্বর্ণের একটি পদক, পদকের একটি রেপ্লিকা, নগদ ৩ লাখ টাকা এবং একটি সম্মাননাপত্র প্রদান করা হয়। স্বাধীনতা দিবসের আগেই রাষ্ট্রীয় আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদক তুলে দেন।
তবে মুকিত মজুমদার বাবুর নাম ঘোষণার পরই সামনে আসে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলার তথ্য। জানা যায়, গত বছর ১০ ফেব্রুয়ারি মো. সুমন নামের এক ব্যক্তি বাদী হয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার নম্বর ৬২/১৬৯ এবং এতে পেনাল কোডের ১০৯, ৩০২, ১১৪ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার এজাহারে আব্দুল মুকিত মজুমদারকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে উল্লেখ করে তাকে ৮ নম্বর আসামি করা হয়েছে। মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নাম রয়েছে।
এ বিষয়ে একটি ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান। তিনি জানতে চান, একজন ব্যক্তি যার বিরুদ্ধে এমন একটি হত্যা মামলায় আসামি হিসেবে নাম রয়েছে, তাকে ঠিক কীভাবে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হলো? তার ভাষ্য অনুযায়ী, মামলাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে—তবুও এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে তাকে এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তিনি আরও জানতে চান, এটি কি আমলাদের কোনো সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রভাব রয়েছে।
আব্দুল মুকিত মজুমদার বাবু দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইমপ্রেস গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। পরিবেশ সংরক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৯ সালে তিনি ‘প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ২০১০ সালে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও অভিযোজন বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির জন্য চ্যানেল আই-এ ‘প্রকৃতি ও জীবন’ নামে ধারাবাহিক তথ্যচিত্রভিত্তিক অনুষ্ঠান চালু করেন, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রচারিত হয়ে আসছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পরিবেশ সংরক্ষণে অবদানের জন্য তিনি একাধিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘জাতীয় পরিবেশ পদক-২০১২’, ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন-২০১৩’ এবং ‘জাতীয় পরিবেশ পদক-২০১৫’। এসব সম্মাননা তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকেই গ্রহণ করেছিলেন।
এদিকে, তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার বিষয়ে জানতে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেসবাহ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি বর্তমানে থানার বাইরে রয়েছেন। তাই এ ধরনের কোনো মামলা রয়েছে কি না তা যাচাই করে পরে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন।
অন্যদিকে মামলার এজাহারে বাদী হিসেবে উল্লেখ থাকা মো. সুমনের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়, ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

Leave a Reply